আলাদা প্রশ্নে বাড়বে শিক্ষার বৈষম্য

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০০ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজ্ঞান বিভাগের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের নিজস্ব কারিকুলাম অনুযায়ী আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পাঠক্রম বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের থেকে ভিন্ন। বর্তমান ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন না; বরং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যান। ফলে দেশেই তাদের ধরে রাখতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরে রাখতে আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আরও বড় বৈষম্য তৈরি করবে কিনা?

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন এই যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাদের কারিকুলাম, বিষয়বিন্যাস এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা। এদিকে ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র করা হলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ থাকবে না। ফলে ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের নম্বরের ভিত্তিতে কীভাবে মেধা তালিকা করা হবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া এমন সিদ্ধান্তের ফলে ইংরেজি মিডিয়ামের বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। ঢাবিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা মূলত একটি অভিন্ন মাপকাঠিতে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা। সেখানে আলাদা কারিকুলামের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হলে প্রশ্ন উঠবে দুটি ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাওয়া নম্বর কীভাবে একই মেধাক্রমে তুলনা করা হবে?  দুটি প্রশ্নপত্রের কঠিনতার মাত্রা যদি সামান্যও ভিন্ন হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী অন্যজনের তুলনায় সুবিধা বা অসুবিধায় পড়তে পারেন। ফলে শুধু প্রশ্নপত্র আলাদা করলেই সমতা নিশ্চিত হবে না; বরং প্রয়োজন হবে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষার মান সমতাকরণ, প্রশ্নের কঠিনতা নির্ধারণ এবং দুই ধারার ফলাফল তুলনাযোগ্য করার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

পাঠক্রম ভিন্ন মানেই মেধা যাচাইয়ের মাপকাঠিও ভিন্ন হতে হবে এমন নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন একটি ভর্তি পরীক্ষা তৈরি করতে পারে না, যেখানে পাঠক্রমের পার্থক্যকে বিবেচনায় রেখেও সবার মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবোধ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার সক্ষমতা একই মাপকাঠিতে যাচাই করা হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন ভাবনা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানতে চাইলে জীববিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবদুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশে প্রচলিত সাধারণ অনার্সে না গিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে দেশ মেধাবীদের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, প্রশ্ন ব্যবস্থার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে যায়।’

আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়ে সমন্বিত মেধা তালিকা করা হলে বৈষম্য হবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এতে কোনো বৈষম্য হবে না। যে যত নম্বর পাবে, তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হবে। আমরা চেষ্টা করব, প্রশ্নের মান সমান রাখতে।’

তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ঢাবি কলা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘বৈষম্য নানাভাবে হয়ে থাকে। ইংরেজি মিডিয়ামের কারিকুলাম বাংলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে একই প্রশ্ন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঢাবিতে যে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, তাও এক ধরনের বৈষম্য। আবার এই বৈষম্য কমাতে গিয়ে যদি আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়ে সমন্বিত মেধা তালিকা করা হয়, তাহলেও নতুন করে বৈষম্যের শুরু হবে। একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ঢাবির একাডেমিক কাউন্সিলের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, একাডেমিক কাউন্সিলের বেশিরভাগ সদস্য প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয়। একাডেমিক কাউন্সিলে বিষয়টি তোলা হলে, তা আটকে দেওয়া হবে। তারা মনে করেন, নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা ঢাবিতে আসতে চান না। এমন অনেক উদাহরণ আছে, চান্স পাওয়ার পরও তারা ঢাবি ছেড়ে বিদেশ চলে যান।

ঢাবির ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে ঢালাও পরীক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে যদি দক্ষতা ও যোগ্যতাভিত্তিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হতো, তাহলে অধিক কার্যকর হতো। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের যে বিষয়ে আগ্রহ ও যোগ্যতা বেশি, তাকে সে বিষয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হতো।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভিন্নধারা ও ভিন্নধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোন করলেও এটা সম্ভব। কারণ এই পদ্ধতিতে সমন্বিত পদ্ধতিতে কমন প্রশ্ন করা হতো। তখন ধরনের শিক্ষার্থীদের জন্য উত্তর করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইংরেজি মিডিয়ামের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইংরেজি মিডিয়ামের প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ আরও বাড়বে। এটা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পথে  সহায়ক। আবার মাদ্রাসা, কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ঢাবি কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিলে আগামীতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও আলাদা প্রশ্নপত্রের দাবি তুলতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে একই ছাতার নিচে না নিয়ে এভাবে বিভক্তি সৃষ্টি করলে তা নানা সংকট তৈরি করবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় একাধিক ধরনের প্রশ্নপত্র তৈরির দাবি জোরালো হতে পারে।

তারা বলেন, সবাই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে তা নয়, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ও একই সিদ্ধান্ত নিতে চাপের মুখে পড়বে। একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে তার শিক্ষা মাধ্যমের কারণে আলাদা প্রশ্ন পাওয়ার যুক্তি দেখাতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি, বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ কিংবা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও একই ধরনের দাবি উঠতে পারে। তখন বলা হতে পারে ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছি, তাই আলাদা প্রশ্ন চাই। মাদ্রাসায় পড়েছি, তাই আলাদা প্রশ্ন চাই। কারিগরি শিক্ষায় পড়েছি, তাই আলাদা প্রশ্ন চাই। এভাবে চললে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মূল দর্শন ‘অভিন্ন মানদ-ে যোগ্যতা যাচাই’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করা। শিক্ষা ক্ষেত্রে কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া কিংবা প্রাধ্যন্য দেওয়ার সুযোগ নেই। একাদশের পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর মূল বিষয় একই। কেউ বাংলায় পড়ে, কেউ ইংরেজিতে পড়ে। এই চিন্তা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা ইংরেজি উভয় অপশন রাখা হয়। তাই এখানে বৈষম্যের সুযোগ কম।

ঢাবি উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন প্রশ্নপত্র আলাদা হলেও ফলাফল একসাথেই প্রদান করা হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জেড মেথড ফলো করা হবে। এই পদ্ধতিতে বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিকভাবে ভর্তি কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। একাডেমিক কাউন্সিলে পাস করেই তা কার্যকর করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত