প্রাণ হারালেন সাতক্ষীরার দুজন, মরদেহ আসবে আজ অথবা কাল

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৮ এএম

ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে প্রাণ হারানো ৮ বাংলাদেশির মধ্যে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার দুজন রয়েছেন। তারা হলেন মো. আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫) ও রেবতী সরকার (৩৬)। তারা জীবন বাঁচাতে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে হোটেলে অবস্থান করে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মারা গেলেন। তাদের মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা। নিহত সবার ময়নাতদন্ত গতকাল কলকাতায় সম্পন্ন হয়েছে। সেখানকার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন সূত্র জানিয়েছে, আজ শুক্রবার রাতে অথবা আগামীকাল শনিবার মরদেহগুলো দেশে আসতে পারে।

নিহত আলিমুজ্জামান সাজুর গ্রামের বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামে। তিনি মো. ইউনুস আলী সরদারের ছেলে। সাজু চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তার চিংড়ি ঘের ছিল। তিনি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র তাজকিন আহমেদ চিশতীর খালাতো ভাই।

নিহতের আরেক খালাতো ভাই তাহমিদ শাহেদ চয়ন জানান, আলিমুজ্জামান সাজু পিঠের ব্যথার চিকিৎসা নিতে প্রায় এক সপ্তাহ আগে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসা নিয়ে ঘটনার দিন (১৯ আগস্ট, বুধবার) কলকাতার ওই হোটেলে ওঠেন। বুধবারই তার দেশে ফেরার কথা ছিল।

সাজুর বড় ভাই সাহেব সরদার বলেন, হঠাৎ টেলিভিশনে দেখি কলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগেছে। পরে জানতে পারি, ওই হোটেলেই আমার ভাই অবস্থান করছিল। একজন আত্মীয়কে সেখানে পাঠানো হয়। পরে ছবির সঙ্গে লাশের মিল পাওয়ার পর নিশ্চিত হই, আমার ছোট ভাই আর নেই।

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার ভাইয়ের মরদেহটা যেন দ্রুত দেশে এনে আমাদের কাছে দেওয়া হয়। আমরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে চাই।

রেবতী সরকার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ইটভাটা শ্রমিক ভবেশ সরকারের স্ত্রী। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে তালা ঝুলছে। চারপাশে নীরবতা। জানা যায়, পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করছেন। রেবতীর ছেলে অনিক সরকার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও মেয়ে ত্রিশা সরকার ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। তারা বর্তমানে উত্তরাখ-ে অবস্থান করছেন। ভবেশ সরকার দেশে থাকলেও তিনি এখন কোথায় কেউ বলতে পারেননি।

স্থানীয় প্রতিবেশী বিক্রমজিৎ সরকার জানান, রেবতী সরকার ১০-১২ দিন আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন।

বুধবার ভোর আনুমানিক ৩টার দিকে হোটেলটির চতুর্থ তলায় অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এ সময় হোটেলের অধিকাংশ অতিথি নিজ নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, বাইরে থেকে সরাসরি আগুনের শিখা দেখা না গেলেও মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। হোটেলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির মধ্যে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ জানান, ভারতের হাই কমিশন থেকে লাশ দুটো দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখছেন।

ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, মরদেহ আনার প্রস্তুতি : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিহত সাত বাংলাদেশির ময়নাতদন্ন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত করা হয়। দুই দেশের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আজ শুক্রবার রাতে অথবা আগামীকাল শনিবার মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন সূত্র। নিহত সাংবাদিক দেবাশীষের আত্মীয় ও ভারতের মালদহের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দীও একই তথ্য জানান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ভারতের মালদহের বাসিন্দা কৃষ্ণ নন্দী জানান, সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত পরিবারের চারজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনে গেছেন। এর আগে সকালে কলকাতার নিউমার্কেট থানা থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন।

কৃষ্ণ নন্দী বলেন, দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়া যত দ্রুত শেষ হবে, তত দ্রুত মরদেহ বাংলাদেশে আনা সম্ভব হবে।

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার ভাড়া বাসায় থাকত দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবার। দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত বলেন, ‘ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির মরদেহের অপেক্ষায় দিন কাটছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য বলতে এখন আছি আমিই একা। বুকের ভেতর তীব্র কষ্ট থাকলেও তা প্রকাশ করতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সংসারে দেবাশীষই ছিল মূলধন। আমরা দুজনই হৃদরোগে ভুগছি। যে বাসায় থাকি, সেখানে মাসে সাত হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। দেবাশীষ ভারতে যাওয়ার সময় একমাত্র মেয়ে মহিমা (৬)কে দাদির কাছে রেখে গিয়েছিল। এখন মেয়েকে কীভাবে মানুষ করব? তাকে দেখাশোনা করাও আমার জন্য কষ্টকর। এখন আমরা কোথায় যাব, কী করব কিছুই জানি না। খেয়ে থাকব, নাকি না খেয়ে থাকব, সেটাও জানি না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই নেই। এই সংসার কীভাবে চলবে, তা দেখার মতো কেউ নেই। সরকারের কাছে আবেদন, শিশুটিকে নিয়ে যেন আমরা বেঁচে থাকতে পারি, সেই সহযোগিতা করুন।’

দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আজকের আলো নামের একটি স্থানীয় পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তার মৃত্যুতে শোকাহত সহকর্মী, স্বজন ও কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজ।

ইজারাদার গ্রেপ্তার আটক আরও ২ জন : কলকাতার নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখা ইন’-এ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। গ্রেপ্তার হওয়া আবু জাফর ওই হোটেলটির ইজারাদার ছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার জানিয়েছে, গত বুধবার রাতে এন্টালি মার্কেট এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সূত্রের খবর, হোটেল ‘শিখা ইন’ আবু জাফরের নামেই ইজারা নেওয়া হয়েছিল; তিনি জোড়াসাঁকোর বাসিন্দা। তবে হোটেল মালিক বীরেশ্বর মিত্রের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি।

আনন্দবাজার জানিয়েছে, আবু জাফর ছাড়াও এ ঘটনায় আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের নাম-পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে সূত্রের খবর, আটক দুজনের মধ্যে কাছের হোটেল ‘যাপন’-এর একজন কর্মী রয়েছেন। এ হোটেলটির মালিকও বীরেশ্বর মিত্র। অগ্নিকাণ্ডের পর মির্জা গালিব স্ট্রিটের ৯টি হোটেল ও ৪টি রেস্তোরাঁকে নিরাপত্তাবিধি না মানার অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে দমকল দপ্তর। মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা একটি ভবনে একাধিক হোটেল ও অতিথি নিবাস ছিল। অভিযোগ, ভবনটির হোটেলগুলোতে ছিল একাধিক ঘুপচি ঘর। এর তৃতীয় তলায় ১১০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে চলছিল ‘শিখা ইন’। দুই কামরার একটি ফ্ল্যাটের সমান জায়গায় সেখানে ছিল পাঁচটি খুপড়িঘর।

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ওই হোটেলে আগুন লাগে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৯ জন। তাদের মধ্যে অন্তত আটজন বাংলাদেশি। দমকলের সদর দপ্তর থেকে অল্প দূরত্বে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে বুধবারই বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ-লালবাজার। অভিযোগ উঠেছে, শিখা ইনসহ ওই ভবনে চলা হোটেলগুলো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাবিধি না মেনেই গড়ে উঠেছিল। আবাসিক ভবনকে বে-আইনিভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ অগ্নিকাণ্ডের জন্য পূর্বের সরকারের ‘অবহেলাকে’ দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, আগের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এসব বিষয় থেকে নজর ঘুরিয়ে রেখেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত