নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৯ এএম

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। ডারউইনে প্রথম টেস্টে অবিশ্বাস্য ৯ উইকেটের জয়ের পর এবার ম্যাকাইয়ে সিরিজ জয়ের সমীকরণ মেলাতে নামবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শনিবার শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্তরা জিতলে তো বটেই, ড্র করলেও প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের কীর্তি গড়বে। ফলে নতুন ভেন্যুতে হতে যাওয়া এই টেস্ট ঘিরে দুই দলের জন্যই আলাদা গুরুত্ব। বাংলাদেশের সামনে সেখানে নিজেদের প্রথম টেস্টের সাফল্য ছাড়িয়ে যাওয়ার হাতছানি, অস্ট্রেলিয়ার সামনে সিরিজ বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ডারউইন টেস্ট জয়টি ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য। হাসান মাহমুদের ছয় উইকেটের সামনে অজিরা প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় ১৯৮ রানে। পরে তানজিদ হাসান তামিমের প্রথম সেঞ্চুরি ও অধিনায়ক শান্তর লড়াকু ইনিংসে সফরকারীরা তোলে ৪২৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরিতে অজিরা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেটে ২৮৪ রানে থামে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ঐতিহাসিক জয় পায় বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে পাওয়া এই জয়ই এখন তাদের সিরিজ জয়ের সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

এই ম্যাচের আগে দলে শক্তি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। চোট কাটিয়ে যোগ দিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। তবে এই বাঁহাতি পেসারের জায়গায় প্রথম টেস্টে সুযোগ পাওয়া এবাদত হোসেন প্রথম নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছেন। তা ছাড়া সহজে ‘উইনিং কম্বিনেশন’ ভাঙতে চায় না টিম ম্যানেজমেন্ট। গতকাল প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের কণ্ঠেও তেমন বার্তা পাওয়া গেল, ‘আসলে এটা (একাদশ) এখনো ঠিক করিনি। আগামীকাল (আজ) চূড়ান্ত করব।’ ম্যাকাইয়ে প্রথম দিনের অনুশীলন শেষে শরিফুলের প্রসঙ্গ উঠলে এই ক্যারিবীয় বলেন, ‘সে ভিন্ন কিছু এনে দেয় আমাদের দলে। তবে মাত্রই টেস্ট ম্যাচ জিতলাম। ফলে জেতার একাদশে বদল আনার সম্ভাবনা কম। তবে এগুলো শুধুই সম্ভাবনা, আগামীকাল (আজ চূড়ান্ত) সিদ্ধান্ত নেব।’

তবে চিন্তার কারণ ডারউইন টেস্টে সেঞ্চুরি করা ওপেনার তামিমের অস্বস্তি। জানা গেছে, কাঁধে হালকা ব্যথা আছে তার। গতকাল ফিল্ডিং অনুশীলন করলেও সাবধানতার জন্য তাকে ব্যাটিংয়ে পাঠায়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে ম্যাচের আগে আজ ব্যাটিং করার কথা আছে তার। তবে বিকল্পও ভেবে রেখেছে সফরকারীরা। এজন্য নেটে আরেক ওপেনার সাদমান ইসলামের সঙ্গে শুরুর দিকে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করেন সৌম্য সরকার। এই অনুশীলনে তাসকিন আহমেদের বিপক্ষে ব্যাটিং করার সময় আঙুলে চোট পান অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। তবে প্রাথমিক শুশ্রƒষার কিছুক্ষণ পর আবার ব্যাট করতে নামেন তিনি।

এসব ছাপিয়ে ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নতুন ভেন্যুর উইকেট। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় এই প্রথম টেস্ট ম্যাচ হতে যাচ্ছে। ফলে এখানকার উইকেট কী ধরনের আচরণ করবে, তা নিয়ে দুই দলেরই আগ্রহ আছে। তবে উইকেট দেখে সিমন্স বেশ সন্তুষ্ট। ব্যাটারদের জন্য ভালো সুযোগ দেখছেন সফরকারী কোচ, ‘পিচটা দারুণ। কিছুটা ঘাস আছে। অনেক শক্ত। ভালো টেস্ট উইকেট। প্রতিটি উইকেটই ব্যাটারদের জন্য ভালো। ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি ঠিকভাবে ব্যাট করতে পারছেন কি না।’

ম্যাকাইয়ের কন্ডিশন নিয়েও আগ্রহ কম নয়। ডারউইনের মতো এখানেও বাতাস বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রথম টেস্টের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ জানে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিমন্সের মতে, ‘ডারউইনেও অনেক বাতাস ছিল। দুই দলকেই এভাবে খেলতে হবে। ভালোভাবে মানিয়ে নিতে হবে। আগে আসতে পেরে তাই ভালোই হয়েছে। আমরা জানি এখানে কী কন্ডিশন। ছেলেদের কেবল মানিয়ে নিয়ে ভালো খেলতে হবে।’

বাংলাদেশের এমন আত্মবিশ্বাসের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া নামবে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ নিয়ে। প্রথম টেস্টে দুই ইনিংসেই ব্যর্থ জেক ওয়েদারল্ডকে বাদ দিয়ে দলে ফেরানো হয়েছে অভিজ্ঞ ম্যাট রেনশকে। প্রায় আড়াই বছর পর টেস্ট দলে ফেরা এই টপ ব্যাটারকে ঘিরে তাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে স্বাগতিকদের সবচেয়ে বড় ভরসা থাকবে স্টিভ স্মিথ, ট্রাভিস হেড ও গ্রিনের ওপর। ডারউইনে সেঞ্চুরি করা গ্রিনের জন্য ম্যাকাই অবশ্য শুধু ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গা নয়, ব্যক্তিগতভাবেও সুখস্মৃতির ভেন্যু। নিজের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির পর এই মাঠে ফিরতে পেরে ভালো লাগার অনুভূতি শোনান এই অলরাউন্ডার, ‘  যেখানে আপনার ভালো স্মৃতি আছে, সেখানে ফিরে আসা সবসময় দারুণ। সর্বশেষ যখন এসেছিলাম ভালো সময় কেটেছিল। এখানেও বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা আছে। ভালো কিছু ম্যাচ হয়েছে এখানে। ফিরে স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে।’

তবে পুরনো স্মৃতির পাশাপাশি নতুন টেস্ট ভেন্যুর উইকেট নিয়েও আশাবাদী গ্রিন। সাদা বলের ক্রিকেটে ম্যাকাইয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও লাল বলের ক্রিকেটে এখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি, ‘এখানে অনেক সুন্দর উইকেট হয়। যদিও সাদা বলের ক্রিকেট ও লাল বলের ক্রিকেট ভিন্ন। তবে আমরা খুব ভালো উইকেট আশা করছি। বাউন্স থাকবে এবং ফাস্ট হবে।’

ম্যাকাইয়ের উইকেট যদি সত্যিই গতি ও বাউন্সের সঙ্গে ব্যাটারদের জন্য ভালো সুযোগ তৈরি করে, তাহলে দুই দলের ব্যাটিং লাইনআপের সামর্থ্যও পরীক্ষায় পড়বে। বাংলাদেশের জন্য শান্ত, মুশফিক, মুমিনুল হক, লিটন দাসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তামিমের আত্মবিশ্বাস বড় শক্তি। আর বোলিংয়ে হাসান, তাসকিনদের পেস আক্রমণের সঙ্গে মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের স্পিন বাংলাদেশের ভারসাম্য ধরে রাখার বড় অস্ত্র।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের হিসাবেও এই ম্যাচের গুরুত্ব আছে। প্রথম টেস্ট হেরেও ৯ ম্যাচে ৭ জয় নিয়ে শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকা যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে। পাঁচ ম্যাচে তিন জয়, এক হার ও এক ড্র নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ফলে ম্যাকাইয়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা জিতলে বা ড্র করলে সিরিজের ইতিহাস তো বদলাবেই, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়েও তাদের অবস্থান আরও শক্ত হবে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সামনে ঘরের মাঠে সিরিজ হার এড়ানোর চ্যালেঞ্জ। নিজেদের দীর্ঘ টেস্ট ইতিহাসে ঘরের মাটিতে এমন সিরিজ হার তাদের জন্য বিরল ঘটনা হবে। তাই ম্যাকাইয়ে শুধু ম্যাচ জেতাই নয়, প্রথম টেস্টের ধাক্কা সামলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণ করতে চাইবে প্যাট কামিন্সের দল। বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্রে থাকছে ডারউইনের জয়। সিমন্সের দল সেই আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্জনকে আরও উঁচুতে নিতে চাইবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত