বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি গর্হিত কাজ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ এএম

বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানো মুমিনের গুণ নয়। এটা খুবই নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ। এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া কাম্য। আর কোনো পণ্যের ঘাটতির খবর শুনে আমরা অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে ঘরে জমিয়ে রাখি এবং ভাবি, এতে অন্তত আমার পরিবারের ভবিষ্যৎ কিছুটা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু একই কাজ যখন অনেক মানুষ করেন, তখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সেই চেষ্টাও সম্মিলিতভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। আর কেউ যখন মানুষের দুর্ভোগকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফা করেন, তখন নৈতিকতার বিষয়টি সামনে আসে।

ইসলাম ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল উপার্জনকে মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জনের অনুমতি দেয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা ১৮৮)

এই আয়াত আজকের বাজারের ক্ষেত্রে ব্যবসার নৈতিক দিকটি তুলে ধরে। ব্যবসায় ন্যায্য লাভ করা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু যদি ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন, পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করেন, মজুদ করে বাজারে চাপ তৈরি করেন কিংবা মানুষের দুরবস্থাকে অতিরিক্ত লাভের সিঁড়ি বানান, তাহলে লাভের অংক যত বড়ই হোক, নৈতিক দায়ও তত গভীর হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারি করে সে পাপী।’ (সহিহ মুসলিম) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে লোক চল্লিশ দিন খাদ্যপণ্য মজুদ করে রাখে সে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা)

এসব ক্ষেত্রে দায় শুধু ব্যবসায়ীর নয়। ভোক্তারও দায়িত্ব রয়েছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটা, অযথা অপচয়, গুজবে কান দিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো কিংবা যাচাইহীন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া, এসবও সংকটকে তীব্র করতে পারে। কোরআন আমাদের সংবাদ যাচাইয়ের শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো।’ (সুরা হুজুরাত ৬)

একজন ব্যবসায়ীর দোকান কি শুধুই বেচাকেনার স্থান? না, সেটি মানুষের আস্থারও জায়গা। তিনি জানেন লাভ করা তার জন্য অপরাধ নয়। কিন্তু অন্যায়ভাবে লাভ করা তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে ক্রেতাকেও মনে রাখতে হবে যে, নিজের ঘরে অতিরিক্ত পণ্য মজুদের বিষয়টি কখনো কখনো অন্য পরিবারে পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে।

ইসলাম আমাদের শুধু নিজের কথা ভাবতে শেখায় না, বরং প্রতিবেশীর ক্ষুধা, অসহায়ের কষ্ট এবং সমাজের কল্যাণের কথাও ভাবতে শেখায়। তাই সংকটের বাজারে অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করাও নৈতিক দায়িত্ব। অতএব সংকটের সময় শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। রাষ্ট্রকে ন্যায়সংগত নীতি গ্রহণ করতে হবে, ব্যবসায়ীকে সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে হবে, ভোক্তাকে সংযমী হতে হবে এবং নাগরিককে তথ্য প্রচারের আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে। এই সম্মিলিতি দায়িত্ববোধই সমাজকে বিভিন্ন অস্থিরতা থেকে রক্ষা করতে পারে।

একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বাজেট, রিজার্ভ, উৎপাদন কিংবা বাজারদরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর গভীরে থাকে মানুষের পারস্পরিক আস্থা। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হয় সামাজিক বন্ধনে।

সংকট হয়তো একদিন কেটে যাবে। বাজারও স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে আমরা যে চরিত্র প্রকাশ করি, সেটিই আমাদের প্রকৃত পরিচয় হয়ে থাকবে। কারণ সংকট মানুষের বিবেকের পরীক্ষা নেয়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই, অন্যের কষ্টকে নিজের লাভের সিঁড়ি বানানো নয়, বরং মানুষের দুর্দিনে তার পাশে দাঁড়ানো। তাই বাজারে সংকট দেখা দিলে আমাদের বিবেক যেন সংকুচিত না হয়, বরং আরও যেন জাগ্রত হয়। পণ্যের দাম বাড়তে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেকের দাম কখনো কমে যাওয়া উচিত নয়।

লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত