নবীজির বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ এএম

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় একজন হজরত আবু বকর (রা.)। তিনি ইসলামের অনেক খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তার মাধ্যমে মুসলমানরা অনেক উপকৃত হয়েছে। তিনি ছিলেন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ^স্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাদের বয়সের পার্থক্য ছিল মাত্র দুই বছরের। এ হিসেবে তাদের উভয়ই প্রায় সমবয়সী ছিলেন। ছোট থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন।

হজরত রাসুল (সা.)-এর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে সেই বন্ধুত্ব অটল ছিল। ইসলামে তার অবদান এত বিশাল যে, তাকে ইসলামের দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। হজরত রাসুলুল্লাহর (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলমানরা আমিরুল মুমিনিন ও খলিফা হিসেবে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে মনোনীত করেন। তার খেলাফত কাল ছিল দুই বছর ৩ মাস ১১ দিন।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ৫৭৩ সালে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম আবদুল্লাহ। বাবার নাম আবু কুহাফা এবং মায়ের নাম সালমা বিনতে সাখার। তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র পুত্রসন্তান। অত্যন্ত আদর-যতœ, ভালোবাসা ও বিলাসিতার মধ্য দিয়ে তিনি বড় হন। তার দুটি উপাধি সর্বাধিক পরিচিত। তা হলো আবু বকর ও সিদ্দিক। এ দুটি উপাধি জাহেলিয়াত ও ইসলাম উভয় যুগেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে। তার অপর একটি উপাধি ছিল আতিক। অতি সুন্দর সুরতকে আতিক বলা হয়। হজরত আবু বকর (রা.) ছিলেন অতি সুদর্শন ও সুন্দর।

তিনি ছিলেন তার গোত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয়, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী, দানশীল ও চরিত্রবান। জাহেলি যুগেও কখনো তিনি মদপান করেননি। তিনি ছিলেন সম্মানিত কুরাইশ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সৎ চরিত্রের জন্য মক্কার সব মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তিনি। আরববাসীর নসব বা বংশসংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। কাব্য প্রতিভাও ছিল তার। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর নিত্যদিনের সঙ্গী। তিনি সব সময় মুহাম্মদ (সা.)-কে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশায়, সহায়-সম্বলহীনতায় এবং দুস্থদের সাহায্য করতে তিনি ছিলেন নিবেদিত। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তার কাছে সঞ্চিত ৪০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ইসলামের কল্যাণে তিনি রাসুলুল্লাহর কাছে প্রদান করেন। তাবুকের যুদ্ধে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হলে আবু বকরের কাছে দান করার তেমন কিছুই ছিল না। তাই তিনি ব্যাকুল চিত্তে ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাব, কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে চুলার ছাই পর্যন্ত (যুদ্ধে আহত যোদ্ধাদের ক্ষতস্থানে ছাই উপকারী) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে প্রদান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সময় তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? উত্তরে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-কে।’ বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ ছাড়াও হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরের সময় এবং মক্কা বিজয়ের সময় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশেই ছিলেন।

হজরত রাসুলুল্লাহকে (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার কাছে কে সবচেয়ে বেশি প্রিয়? তিনি বলেন আয়েশা। সাহাবিরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো, পুরুষদের মধ্যে কে আপনার সবচেয়ে প্রিয়? রাসুল (সা.) বললেন, তার (আয়েশার) পিতা (আবু বকর)। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় বলতেন, যারা আমার প্রতি কোনো প্রকারের এহসান বা উপকার করেছে, আমি তাদের প্রতিদান দিয়েছি আবু বকর ছাড়া। আমার ওপর তার বিরাট উপকার রয়েছে, তার প্রতিদান কেয়ামতের দিন স্বয়ং মহান আল্লাহ দেবেন। হজরত রাসুলুল্লাহর (সা.) বক্তব্যের ব্যাখ্যা অপর একটি উক্তিতে বিদ্যমান। তিনি বলেন, আমার প্রতি কারও উপকার আবু বকর (রা.) অপেক্ষা বেশি নয়। তিনি তার জানমাল দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। উপরন্তু তার কন্যাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আসমানে নক্ষত্ররাজি ঝকঝক করছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার উম্মতের মধ্যে কারও নেকি বা পুণ্য কি আসমানের তারকারাজির সমান হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আয়েশা! ওমরের পুণ্যগুলো আসমানের তারকারাজির সমান হবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমার ধারণা ছিল যে, আপনি আমার আব্বাজানের নাম উল্লেখ করবেন। আয়েশা (রা.) আবার বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে আমার আব্বাজানের পুণ্য কেমন হবে? রাসুল (সা.) বললেন, বিচলিত হওয়ার কিছু নেই আয়েশা! আবু বকরের কেবল হিজরতের রজনীর পুণ্যগুলো ওমরের সমগ্র জীবনের পুণ্যগুলোর চেয়ে বেশি হবে। (মিশকাত)

হজরত রাসুল (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-কে হিজরি নবম সালে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে আমিরুল হজ মনোনীত করে মক্কায় পাঠান এবং ইন্তেকালের পূর্বে তিনি ১৭ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করেন। তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা পবিত্র কোরআনের ১৭টি স্থানে ইশারা-ইঙ্গিতে বলা হয়েছে।

খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণের পর তিনি সর্বপ্রথম যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, সেগুলো হচ্ছে প্রথমত জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ। দ্বিতীয়ত নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারদের মূলোৎপাটন। তৃতীয়ত মুরতাদ দমন। এ ছাড়া তার সময়ে সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। তার যোগ্য নেতৃত্বের ফলে খুব সহজেই ধর্মত্যাগীদের ফেতনা দমন করা সম্ভব হয়।

ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) ৬৩৪ সালে ইন্তেকাল করেন। তিনি চেয়েছিলেন তার কবর যেন হজরত রাসুল (সা.)-এর পাশেই দেওয়া হয়। তাই তাকে সেখানেই সমাহিত করা হয়।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত