হার না মানা মাহবুবুলের বই নিয়ে লড়াই

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৯ এএম

ছোটবেলার একটি দুর্ঘটনা বঁটি দিয়ে শাক কাটতে গিয়ে ডান চোখে গুরুতর আঘাত। সেই আঘাতে হারিয়ে যায় একটি চোখের দৃষ্টি। কিন্তু থেমে যায়নি জীবন। অন্ধকারকে সঙ্গী করেই আলো খোঁজার পথ বেছে নিয়েছেন মো. মাহবুবুল আলম।

বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স দ্বিতীয় সেমিস্টারে (থিসিস গ্রুপ, ২০২০-২১ সেশন) অধ্যয়নরত। পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন’স কমপ্লেক্সের সামনে বই বিক্রি করেন। এই বই বিক্রির টাকাতেই চলে তার প্রতিদিনের খরচ, পড়াশোনার ব্যয়। পরিবারকেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেন। এক ভাই, এক বোন, মা-বাবাকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার রাজশাহীর মেহেরচন্ডি বুধপাড়া এলাকায়।

বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা শৈশব থেকেই। মা টিফিনের জন্য যে টাকা দিতেন, সেখান থেকে কিছু জমিয়ে বই কিনতেন তিনি। কখনো কখনো টিফিন না খেয়েও সেই টাকা তুলে রাখতেন শুধু বই কেনার জন্য। বইয়ের এই নেশাই একসময় তার জীবনের পথ তৈরি করে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যখন নিজের খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন, তখন এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারেন বই ব্যবসার খুঁটিনাটি। কোথা থেকে বই সংগ্রহ করতে হয়, কীভাবে বিক্রি করতে হয়। সব শিখে নিয়ে ২০২২ সালের মার্চ মাসে শুরু করেন বই ব্যবসার এই পথচলা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আজ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাহবুবুল এক পরিচিত নাম। অন্যদের থেকে তার পার্থক্য তিনি কম লাভে বই বিক্রি করেন। তার দোকানে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, প্রহসন, ধর্মীয় সব ধরনের বই পাওয়া যায়। এমনকি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে আনেন বিদেশি দুষ্প্রাপ্য পুরনো বইও। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই তার প্রধান ক্রেতা।

ডিন’স কমপ্লেক্সের পাশাপাশি ছুটির দিনে শহীদ মিনারের সামনে বইয়ের পসরা সাজান তিনি। কোথাও বইমেলা হলে সেখানেও স্টল দেন। আর এই সবকিছুই করেন পড়াশোনার ফাঁকে যেদিন ক্লাস বেশি থাকে, সেদিন বই নিয়ে বসা হয় না।

তবে পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। বই বিক্রির অভিজ্ঞতায় যেমন আছে আনন্দ, তেমনি আছে কষ্টও। একবার এক জুনিয়ার বাকিতে বই নিয়ে টাকা তো দেয়ইনি, উল্টো বই নেওয়ার কথাই অস্বীকার করেছে। এই ঘটনা আজও তাকে ব্যথিত করে। আবার একবার বই সংগ্রহের কাজে ঢাকায় গিয়ে চরম অর্থসংকটে পড়েছিলেন। পকেটে টাকা ছিল না, না খেয়ে অন্যের সাহায্যে টাকা জোগাড় করে ফিরতে হয়েছিল রাজশাহীতে।

বইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু ব্যবসার নয় সৃষ্টিরও। তিনি ড. সুলতান মাহমুদ রানার সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন ‘ফিলিস্তিনি শিশু বন্দি এবং নির্যাতন’ বইটি, যা শব্দশৈলী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালে একই শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বর্ণশুদ্ধ’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা। পাশাপাশি ‘বর্ণ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদনাও করেছেন। মাহবুবুল আলম জানান, ‘বই তো বিক্রি করছিই, নিজের একটা প্রকাশনা থাকলে মন্দ হয় না’ এই ভাবনাই তাকে নতুন উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করেছে। ভবিষ্যতে বই বিক্রি, গবেষণা ও অনুবাদ নিয়েই কাজ করতে চান তিনি। বইকে ঘিরেই তার স্বপ্ন, তার পরিকল্পনা।

এক চোখে অন্ধকার থাকলেও ইচ্ছাশক্তির আলোয় যে সামনে এগোনো যায় মাহবুবুল আলম তার জীবন্ত প্রমাণ। তার গল্প কেবল সংগ্রামের নয়, এটি স্বপ্ন জয়ের এক অনুপ্রেরণার নাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত