প্রচণ্ড দোদুল্যমানতার মধ্যে সময় পার করছে মলি। বাইরে যাওয়ার জন্য অর্ধেক প্রস্তুত হয়ে বসে আছে। সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পুরোপুরি তৈরি হতে পারছে না। নিজের ওপর নিজেরই বিরক্ত লাগছে। কেন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না! সারা জীবন কি এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় কাটিয়ে দেবে!
লংআইল্যান্ডে এক বন্ধুর বাসায় ক্রিসমাস পার্টিতে যাওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিল মলি। আমাজন অনলাইন থেকে একটা লাল রঙের লম্বা গাউন কিনেছে। আমন্ত্রণকারী বন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক মোটামুটি দাম দিয়ে একটা উপহার কিনেছিল, অভ্যাগতদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এক প্রতিযোগিতার জন্য।
তুষারঝড়ের পূর্বাভাস মলির মনটাকে চঞ্চল করে দিল।
নতুন কেনা গাউনটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায় মলি। লাল রঙটা গায়ে একটু বেশি উজ্জ্বল লাগছে? কিন্তু এত ঔজ্জ্বল্য ওর মনের মেঘ দূর করতে পারছে না। কোমরের কাছে কাপড়টা টানটান মনে হলো। হঠাৎ নিজের শরীরকে নিজের অচেনা লাগে ওর। আগে কি এমন ছিল? নাকি নিজেই অনেকদিন নিজের শরীরের দিকে তাকায়নি!
জুতার র্যাকের দিকে তাকায়। হিল পরলে আত্মবিশ্বাসটা একটু বাড়ে, কিন্তু হাঁটার সময় ভয় হয়। ফ্ল্যাট পরলে নিরাপদ লাগে, কিন্তু নিজেকে ফিকে মনে হয়। শেষ পর্যন্তু জুতা দুটোই আলাদা আলাদা জায়গায় রেখে দেয়।
মনে পড়ে প্রথম চাকরির ইন্টাভিউয়ের দিন। সেদিন ও লিপস্টিক নিয়ে এমন দ্বিধায় ছিল। খুব গাঢ় দিলে বোল্ড মনে হবে, খুব হালকা দিলে আত্মবিশ্বাসহীন। শেষ পর্যন্ত মাঝামাঝি একটি রঙ বেছে নিয়েছিল। চাকরিটা পেয়েছিল মলি। তবু বেরিয়ে এসে মনে হয়েছিল, চাকরির বৈশিষ্ট্য ওর চরিত্রের সঙ্গে যায় না। শুধু সবাইকে খুশি করার জন্য চাকরিটা নিয়েছিল তবুও।
বাইরে যাওয়ার জন্য অর্ধেক প্রস্তুত হয়ে বসে আছে মলি। পোশাক আর গয়না পরা, কিন্তু মেকআপ এখনো করা হয়নি। মলির সাজ বলতে অবশ্য ঠোঁটে লিপস্টিক আর চোখে কাজলই যথেষ্ট। কাজের জায়গায় গেলে হালকা রঙের, দাওয়াতে গেলে গাঢ় লিপস্টিক—এটাই ওর জীবনদর্শন। মেপে চলা, কারও চোখে না পড়া। পছন্দ করে বলে নামি ব্র্যান্ডের অনেক লিপস্টিক আছে ওর সংগ্রহে। অথচ ইউনিভার্সিটিতে থাকতে একটা-দুটোর বেশি লিপস্টিক ছিল না মলির। সব রঙের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগও ছিল না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিপস্টিকের বাক্সটা খুলল মলি। সারি সারি রঙ—ন্যুড, পিংক, মেরুন, গাঢ় লাল। প্রতিটা রঙ যেন সময়ের একেকটা স্তর। প্রতিটি লিপস্টিকের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে জীবনের অনেক স্মৃতি। হঠাৎ বাক্সের একেবারে নিচে পড়ে থাকা ছোট্ট একটা লিপস্টিক চোখে পড়ল ওর। ঢাকনাটা সামান্য ভাঙা, গায়ের রঙ মলিন। দেখে মনে হবে বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি, তবু মলির হাত থেমে গেল ওই লিপস্টিকের ওপর।
এই লিপস্টিকটা কিনেছিল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার প্রথম বছরে। পহেলা ফাগুন উপলক্ষে সব বন্ধুরা মিলে চারুকলা ভবনে যাবে বসন্ত উদযাপন করতে। শাড়ির সঙ্গে লিপস্টিক না দিলে চলে না। ওই সময় মলি নিয়মিত লিপস্টিক দিত না। গাউসিয়া মার্কেট থেকে লিপস্টিকটা কেনার সময় বান্ধবী মেরিনা বলেছিল, ‘এই রঙটা তোর চেহারায় আলাদা করে ধরা পড়বে, দেখিস!’ তখন আলাদা করে ধরা পড়াটা কি মলি ঠিক বুঝত না। তবে চাইত একজন ওকে আলাদা করে খেয়াল করুক।
চারুকলা থেকে কলাভবনে ক্যাম্পাসে ফেরার পুরো পথে মলি খুঁজছিল চেনা সেই দুই মুগ্ধ চোখকে। সেই একজন সেদিন হলুদ পাঞ্জাবির সঙ্গে জিন্সের প্যান্ট পরে এসেছিল। শাড়ি আর মেরুন রঙের লিপস্টিক দেওয়া মলিকে দেখে তার চোখ বিস্ফোরিত হয়েছিল। আর মলির এমন হাসি পেয়েছিল যে বলার নয়। পাশ দিয়ে যেতে যেতে সে বলেছিল,
‘তোমার হাসিটা লিপস্টিকের চেয়েও অনেক সুন্দর।’
কথাটা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করেছিল মলি। নিচতলার কমনরুমে গিয়ে আয়নায় কতবার যে দেখেছিল নিজেকে।
লিপস্টিকটা ঠোঁটে লাগাতেই স্মৃতির দরজা খুলে গেল। কেমিকেলের গন্ধের সঙ্গে মিছিল করে এলো আরও অনেক কিছু—লাইব্রেরির সামনে ভেজা ধুলোর উত্তাপ, মল চত্বরে পড়ে থাকা আমের মুকুলের সৌরভ আর রোকেয়া হলের সামনের ফুটপাতে সারি সারির শালের ওম, রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের পেছনে শেষ বাসের জন্য অপেক্ষার ক্লান্তি।
তখন ভয় ছিল অনেক, মানুষ কী বলবে, ভবিষ্যৎ কী হবে! এত কিছু না ভাবলে জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। দীর্ঘসময় মলির কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে অন্য এক মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল সেই একজন।
প্রথম যেদিন ওদের একসঙ্গে দেখেছিল, মলির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হয়েছিল পুরো হিমালয় পর্বত ভেঙে পড়েছে ওর ওপর। এত খারাপ লাগছিল যে, ক্লাস না করে রিকশায় বাড়ি ফিরে আসে। তারপর দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকল, ওজন কমে গিয়েছিল অনেক। প্রায় এক মাস কোনো ক্লাস করতে পারেনি।
ওর তখন খুব মরে যেতে ইচ্ছে হতো।
কেন সে এমন হলো? কেন মনে এত দ্বিধা, এত অনিশ্চয়তা, কেন সে এমন চির অপ্রস্তুত!
হাত বাড়িয়ে টিস্যুটা নিল, ধীরে ধীরে ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। লিপস্টিকের রঙ সাদা কাগজে ছড়িয়ে গেল—যেন কোনো পুরনো চিঠির কয়েক লাইন। আয়নায় নিজের রঙহীন ঠোঁটকে দেখল মলি। রঙহীন, কিন্তু এই মুখটাই ওর বেশি চেনা। অনিশ্চয়তা যে চেহারায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
আইফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বারবার বদলে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছে এখন। তুষার পড়ার সময় এখানকার রাস্তাঘাট প্রচণ্ড পিচ্ছিল হয়ে যায়। গাড়ি ঠিকভাবে এগোয় না। মলিকে যেতে হবে লং আইল্যান্ডে, নিউইয়র্ক সিটিতে ওর বাড়ি থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্ব।
মলি যে তুষারপাতে গাড়ি চালাতে পারে না তা নয়। কিন্তু সিটির বাইরে এত দূরে যাওয়া, যদি সত্যি তুষারঝড়ের মুখে পড়তে হয়। এখানে তুষারঝড় সত্যিই ভয়ংকর। হাইওয়েতে থাকলে তো কথাই নেই! রাতের বেলা তুষারপাতের মধ্যে হাইওয়েতে গাড়ি চালানো খুব ঝুঁকিপূর্ণ । মলিকে প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা পেয়ে বসে।
গাড়ির চাবিটা টেবিল থেকে তুলে ড্রয়ারে রাখল মলি। মোবাইল ফোনের গ্রুপ চ্যাটে অনেকগুলো নোটিফিকেশন দেখতে পেল। আজকের এই পার্টির জন্য এই গ্রুপ চ্যাটটি খোলা হয়েছিল। একে একে সেখানে জমছিল অন্য বন্ধুদের হাসি, আড্ডা আর পৌঁছে যাবার খবর।
একজন লিখেছে—We’re here!!
একটু পরে আরেকজন লিখল—Starting the game!
Wish you were here, Molly. একজন লিখল মলিকে মেনশন করে।
ও আর নিতে পারছিল না। আজীবন পালিয়ে বেড়ানো মলি গ্রুপ চ্যাট থেকে লিভ নিল।
গ্রুপ চ্যাট থেকে লিভ নিলেও সময় দেখে মলি বুঝতে পারে, সবাই পার্টিতে পৌঁছে গেছে। আর সে রয়ে গেছে ঘরের ভেতর, কোথাও যেতে না পারার কষ্ট নিয়ে, নাকি যেতে চেয়েও যেতে না পারার ভার নিয়ে। এই দোদুল্যমান মনটাই ওর সবচেয়ে বড় কারাগার। একটু বোল্ড হলে জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু মাঝে মাঝে ওই সাহসটুকু অসম্ভব বড় হয়ে দাঁড়ায়।
মলি পুরনো লিপস্টিকটা আবার বাক্সের নিচে রেখে দেয়। কোনো বিদায় নয়, কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। জানালার বাইরে তুষার পড়তেই থাকে। আর ঘরের ভেতর মলি থেকে যায়—দরজার এপাশে, প্রস্তুতির মাঝখানে—যেমনটা তার জীবন চিরকালই থেকে গেছে—অপ্রস্তুত, সিদ্ধান্তহীন।
সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। এখানে শীতকালে দিনের আলো নিভে আসে খুব তাড়াতাড়ি। তবু মলির মনে হচ্ছে, সন্ধ্যাটা যেন ঠিকমতো নামতে পারছে না, আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে কোথাও আটকে আছে।
তুষারের গায়ে স্ট্রিট লাইটেরে আলো পড়ে দিনের বেলার মতো পরিষ্কার করে তুলেছে চারদিক। জানালার কাচে তুষারের কণা ঠেকছে, একটু শব্দ করে গলে যাচ্ছে, আবার নতুন কণা এসে জায়গা নিচ্ছে। বাইরের রাস্তা ধীরে ধীরে সাদা হয়ে উঠছে। এখানে তুষার পড়লে পুরো শহর রূপকথার গল্পের মতো রূপ নেয়। কিন্তু মলি জানে, এই সৌন্দর্য সাময়িক, দুই দিন পরে তুষার জমে নোংরা বরফে রূপ নেবে, তাপমাত্রা নেমে যাবে বহুগুণ।
জানালার বাইরে তুষার আরও ঘন হয়ে নামছে। আলোয় আলোয় সাদা ঝাপসা। ভেতরে মলির স্মৃতিগুলো যেন রক্তক্ষরণের মতো খুলে বসেছে নিজেদের। যে কথাগুলো সে বলেনি, যে প্রশ্নগুলো সে করেনি, যে জায়গাগুলোতে যে সে যায়নি কখনো—সব একসঙ্গে উঠে আসছে। বাইরে তুষার সব ঢেকে দিচ্ছে আর ভেতরে জমে থাকা দুঃখ বেরিয়ে আসছে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে, কিন্তু তুষার থামে না। মলি ঘরের আলো নিভিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে সব সাদা, ভেতরে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী, যে বারবার প্রস্তুত হয়, কিন্তু কোথাও পৌঁছাতে পারে না।
গল্প
পুরনো লিপস্টিক
মনিজা রহমান
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
অলংকরণ : কাজী যুবাইর মাহমুদ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
×
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০