প্রচ্ছদ রচনা

নারীবাদী নজরুল

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

বিশ শতকের প্রথম ভাগে যখন বাঙালি সমাজে নারীর অবস্থান ছিল প্রধানত অন্তঃপুরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ, তখন নজরুল তার সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীকে বসিয়েছিলেন সমঅধিকার ও অপরাজিত মানবিক সত্তার প্রতীকে। নজরুলের সাহিত্যে নারী নিষ্ক্রিয় সৌন্দর্যের বস্তু বা করুণার পাত্রী হিসেবে উপস্থিত হয়নি, তিনি নারীকে প্রত্যক্ষ করেছেন পুরুষের সমকক্ষ এক সৃজনশীল মহাশক্তি হিসেবে। ‘নারী’ কবিতায় তার সেই যুগান্তকারী ঘোষণা—‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’—ছিল তৎকালীন সামন্ততান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মূলে এক শক্তিশালী আঘাত। নজরুল নারীকে শুধু প্রেয়সী বা মাতৃরূপেই বন্দনা করেননি; মর্যাদা দিয়েছেন সাম্য, বিপ্লব ও জাগরণের অন্যতম কারিগররূপে।

বর্তমান যুগে যখন নারী অধিকার, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং নারীর রাজনৈতিক-সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন তাত্ত্বিক বিতর্ক ও আন্দোলন চলছে, তখন নজরুলের এই চেতনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমাদের প্রাপ্তি, নজরুল শতবর্ষ আগেই আধুনিক নারীবাদী চেতনার এমন এক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, যা আজও আমাদের সমকালীন লিঙ্গসমতা ও নারীমুক্তির লড়াইয়ে দিকনির্দেশক হয়ে আছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে এক নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর মুক্ত চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত হওয়ার কথা থাকলেও, জনপরিসরে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং ‘মব-সংস্কৃতি’ বা বিচারহীনতার প্রবণতা লক্ষিত হচ্ছে। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক ধরনের একপেশে ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ভাবধারার একাংশ নজরুলকে কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ধর্মের প্রচারক হিসেবে উপস্থাপন করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের মূল সত্তা কখনোই কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় আবর্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন অখণ্ড মানবতা, মুক্তি এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে চিরন্তন বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। এই বিপ্লবের আহ্বানে নারীর হাতেই কবি দিয়েছেন আবাহনের গুরুভার। বিশেষ করে তৎকালীন অবরুদ্ধ সমাজবাস্তবতায় নারীকে পূর্ণ মানুষের সম্মান প্রদান এবং সম-অধিকারের দাবিতে তার অবদান বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী বদল এনেছিল। বর্তমানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রক্ষণশীল মানসিকতা যখন নারীর সামাজিক অংশগ্রহণকে সংকুচিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, তখন নজরুল-সাহিত্যে নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সমকালের আলোতে পুনরায় পাঠ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে উঠেছে।

নজরুল-সাহিত্যে নারী ভাবনার প্রধান স্তম্ভ হলো পুরুষ ও নারীর সমমর্যাদার স্বীকৃতি। পাশ্চাত্য সভ্যতার আলোকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক চেতনার যে জাগরণ হয় তার অন্যতম বহিঃপ্রকাশ নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধকাব্যের ‘প্রমিলা’ চরিত্রের মধ্যে তা ধরা পড়ে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উজ্জ্বল মহিমায় নারীরা নবযুগে নতুন চেতনা নিয়ে উদ্ভাসিত হতে পারে তারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতায়। কবিতাটি ১৯২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘লাঙলের’ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ধরণীর তিলোত্তমা মূর্তির পেছনে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমান কৃতিত্বের অধিকারী। কবিতাটিতে নারীর কল্যাণময়ী, সেবাপরায়ণ, প্রেরণাদায়িনী মূর্তি প্রকাশিত। কবি বলেছেন : ‘তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ?/ অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।/ জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য-লক্ষ্মী নারী,/ সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি।’

কবির উপলব্ধি, পুরুষকে ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করলে নারীকে সৃষ্টিশীলতার শক্তির প্রতীক হিসেবে ধরা যায়। যুগ যুগ ধরে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অধিকার উপেক্ষিত। কবিতায় কবি নারীমুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। নারী ও পুরুষের সমঅধিকার বর্তমানে স্বীকৃত, তার বলিষ্ঠ প্রকাশ নজরুলের কবিতার লক্ষণীয় : ‘বেদনার যুগ মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,/ কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি’ (নারী)। এই সাম্যের ভাবনায় নজরুলের মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নারীকে শুধু ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখার অদৃশ্য পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন নজরুলের এই বাণীটি শক্তিশালী জবাব হিসেবে আবির্ভূত হয়। নজরুল বুঝেছিলেন, মানবসভ্যতার ইতিহাস কেবল পুরুষের যুদ্ধ ও অর্জনের ইতিহাস নয়, তাতে রয়েছে নারীর সমান রক্ত, ত্যাগ ও শ্রম।

রক্ষণশীল রাজনীতি নারীকে প্রায়শই ‘নমনীয়’ এবং ‘অসহায়’ সত্তা হিসেবে দেখতে পছন্দ করে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এই সময়ে এসেও ধর্মকেন্দ্রিক পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির বয়ান নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত কিছু নারীরাই। অথচ কত আগে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন : ‘না জাগিলে ভারত ললনা, এ ভারত আর জাগিবে না’ কিংবা ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপে?’ পরাধীন ভারতবর্ষের মূলে যে অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, শ্রেণিবৈষম্য, সামাজিক কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো রয়েছে; নজরুল সেসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। হয়ে উঠেছেন মানুষের কবি, একক কোনো গোষ্ঠীর কবি নন। নজরুলের কবিতায় নারী আবির্ভূত হয়েছে শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক হিসেবে। কবি বলছেন : ‘প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!!/ আজ রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ মহারণ,/ দশ দিকে তার দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!/ পদতলে লোটে মহিষাসুর,/ মহামাতা ঐ সিংহ-বাহিনী জানায় আজিকে/ বিশ্ববাসীকে/ শাশ্বত নহে দানব শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!’ (আগমনী)। নজরুল নারীকে দুর্বল না ভেবে শক্তি ও বিপ্লবের আধার হিসেবে দেখেছেন। তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর সক্রিয় ভূমিকা এবং তাদের ভেতরের সুপ্ত শক্তির জাগরণকেও তিনি উদ্দীপিত করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী যতক্ষণ না নিজের শৃঙ্খল নিজে ভাঙতে শিখবে, ততক্ষণ সমাজের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি অসম্ভব। ধর্মীয় অনুশাসনের নামে এবং রক্ষণশীল রাজনীতির দোহাই দিয়ে নারীদের ওপর যে কড়াকড়ি চাপানো হয়, নজরুল তার বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন। নিপীড়নের প্রতিরোধে বিপ্লবী শক্তির উদ্বোধন ঘটাতে কবি বলেছেন : ‘মহিষ অসুর-মর্দিনী মা গো, জাগ্ এইবার খড়গ ধর।’

অগ্নি-বীণা কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় কবি স্পষ্ট বলেছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা সমাজ আরোপিত কৃত্রিম ‘পর্দা’ ও ‘শৃঙ্খল’ নারীর বিকাশকে রুদ্ধ করে। নজরুল এই শৃঙ্খলকে ভেঙে ফেলে নারীকে মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সমকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীর স্বাধীন পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়, নজরুলের রচনা তাদের সেই ভণ্ডামির ওপর কঠিন আঘাত হানে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে নারীর গৃহস্থালি ও বাইরের শ্রমকে অনেক সময় ‘অদৃশ্য’ করে রাখা হয়। নজরুল তার সর্বহারা কাব্যগ্রন্থ এবং ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় শ্রমজীবী নারীর মর্যাদাকে সুউচ্চ আসনে বসিয়েছেন। নজরুল স্পষ্ট বলেছেন, খেটে খাওয়া মানুষ এবং নারী সমাজের ঘাম ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক নগর ও সভ্যতা। তাই অর্থনীতি ও শ্রমের অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত রেখে কোনো সমাজ এগিয়ে যেতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নারীকে হয় ‘পূজনীয় দেবী’ বানিয়ে বেদিতে বসানো হয়, না হয় ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু নজরুল এই দুই চরমপন্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারীকে রক্ত-মাংসের ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার ডাক দিয়েছিলেন। সমাজের দ্বিমুখীনীতি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে নজরুলের সবচেয়ে বলিষ্ঠ চাবুক সম্ভবত সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ‘বারাঙ্গনা’ কবিতা। কবি বলছেন : ‘কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?/ হয়ত তোমার স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে’ অথবা ‘অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,/ অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!’ সামাজিকভাবে নিপীড়িত ও অস্পৃশ্য নারীদের বুকে টেনে নিয়ে নজরুল সমাজপতিদের প্রশ্ন করেছিলেন। পাপ যদি কেউ করে থাকে, তবে সেই পুরুষ সমাজ কেন শাস্তি পায় না? সমকালে যখন ভার্চুয়াল মাধ্যম কিংবা জনপরিসরে নারীদের চরিত্র হনন করা হয়, তখন নজরুলের এই কবিতাটি সমাজের কুৎসিত মনস্তত্ত্বকে উলঙ্গ করে দেয়। নজরুল বিশ্বাস করতেন নারীর আত্মরক্ষা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা তার নিজের ভেতরই বিদ্যমান। তিনি একদিকে যেমন নারীকে ‘বীরনারী’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, যে নিজের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষায় রাজপথে নামতে ভয় পায় না; একই সঙ্গে তৃষ্ণার্ত-ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ-ক্লান্ত দেহের আশ্রয় খুঁজেছেন নারীতেই। 

রুদ্র-মঙ্গল প্রবন্ধ সংকলনে নজরুল স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, নারী কোনো পূজনীয় বস্তুও নয়, সে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করার সহযোদ্ধা। বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নারীদের প্রতীকী মর্যাদা বা কৃত্রিম ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার নামে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখার যে কৌশল, তার বিপরীতে নজরুলের এই সহযোদ্ধা রূপকল্প অত্যন্ত বৈপ্লবিক। নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস নারীর টিকে থাকার অদম্য সংগ্রাম ও ব্যক্তিত্বের চরম বিকাশের গল্প নিয়ে। চরম দারিদ্র্য, সামাজিক শাসন ও পুরুষতন্ত্রের নিপীড়নের মধ্যেও তার নারী চরিত্ররা নিজেদের আত্মসম্মান বিকিয়ে দেয়নি। জীবনের চরম সংকটেও নিজেদের অস্তিত্ব ও সিদ্ধান্তকে বজায় রেখেছে। যারা মনে করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের সহজেই দমন করা যায়, নজরুলের এই উপন্যাসের চরিত্ররা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

নজরুলের পত্রোপন্যাস বাঁধন-হারায় মাহবুবা চরিত্রটির মাধ্যমে নজরুল নারীর মানসিক মুক্তি ও নিজস্ব পছন্দের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর ওপর যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তার বাইরে গিয়ে নিজের জীবন নিজে চালনা করার অধিকার নজরুলের নারী চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আধুনিক যুগে যখন নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলে, তখন নজরুলের বাঁধন-হারা নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে কথা বলে। নজরুল নারীকে ঘরকন্না বা মাতৃত্বের বৃত্তেও আবদ্ধ রাখেননি। তার কুহেলিকা উপন্যাসে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে নারীরা যে পেছনের সারির নির্দেশিকা পালনকারী নয়, বরং সরাসরি রাজপথে এবং বিপ্লবের সামনের সারিতেও দাঁড়াতে পারে—নজরুল তা দেখিয়েছেন। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও দেখা গেছে নারীদের বাঁধভাঙা অংশগ্রহণ। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখার যে মানসিকতা দেখা যাচ্ছে, তা নজরুলের রাজনৈতিক দর্শনের পরিপন্থী। 

নজরুলগীতিতেও দেখি নারীর বিরহ, প্রেম কেবল আকুতি বা সমর্পণের নয়, সেখানে রয়েছে এক গভীর সম্মান ও সুউচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থান। এমনকি নজরুল তার গজলে ও আধুনিক গানে নারীর মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে অনুধাবন করেছেন। প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি নারীকে কখনোই অধস্তন সত্তা হিসেবে প্রকাশ করেননি, নারীর অনুভূতিকে কাব্যিক ও মানবিক পূর্ণতা দিয়েছেন। 

বেগম রোকেয়ার মতো নজরুলও বিশ্বাস করতেন, সমাজদেহের অর্ধেক অংশ (নারী) পঙ্গু হয়ে থাকলে পুরো জাতি কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। নজরুলকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় দল বা উগ্রবাদী গোষ্ঠী যখন নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তখন নজরুল-সাহিত্যের মূল ভিত্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আমাদের প্রস্তাব, ‘মব-কালচার’ এবং উগ্র মানসিকতার মূল প্রতিষেধক হতে পারে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য। নজরুল কখনো উন্মত্ত জনতা বা কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা বিচারহীনতা সমর্থন করেননি। তার বিদ্রোহী চেতনা ছিল শোষক, অত্যাচারী এবং ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধেই। রাজনীতি যখন নারীদের স্বাধীন চলাফেরা ও সামাজিক অবস্থানকে হেয়প্রতিপন্ন করতে চায়, তখন নজরুলের সাহিত্য আমাদের শেখায় কীভাবে সমতা, সম্প্রীতি এবং অখণ্ড মানবতাবাদী সমাজ গড়ে তুলতে হয়। নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষে অখণ্ড মানবতার, অসাম্প্রদায়িকতার এবং নারীমুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একজন রূপকার নজরুল। সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকুচিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখে দাঁড়িয়ে নজরুলকে পুনরায় পাঠ করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত