দরবেশ রহিম সাধুর ওরসে মিলনমেলা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

মেঠোপথ পেরিয়ে সাহাপুরের মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছালেই যেন বদলে যায় চারপাশের আবহ। কোথাও একতারার টুংটাং, কোথাও দোতারার দীর্ঘশ্বাস, আবার কোথাও বাউলের কণ্ঠে মানুষ ও মানবতার গান। ভক্ত-অনুরাগীদের নীরব প্রার্থনা আর মরমি সুরের মূর্ছনায় মুখর হয়ে উঠেছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার সাহাপুর।

দরবেশ রহিম সাধুর ৩১তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও মাজার প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ওরস। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত, অনুসারী, লালনপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সমাগম ঘটেছে। তাঁদের পদচারণায় মাজার এলাকা পরিণত হয়েছে এক আত্মিক মিলনমেলায়।

ওরসকে ঘিরে আয়োজন করা হয়েছে লালনসংগীত, সাধু-সঙ্গ, মরমি ও ভাবসংগীতের আসর। শনিবার (২৯ আগস্ট) আয়োজনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লালনশিল্পীরা পরিবেশন করবেন মানুষ, আত্মঅন্বেষণ, প্রেম ও মানবতার গান। আগামীকাল রবিবার (৩০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত হবে ভাবসংগীতের আসর। যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও মরমি দর্শনের নানা দিক উঠে আসবে সুর ও কথায়।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে মরমি গান শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খোঁজার এক দীর্ঘ সাধনা। লালন, বাউল ও সাধু-সঙ্গের দর্শনে ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক বিভেদের চেয়ে মানুষকেই বড় করে দেখার যে চেতনা, সাহাপুরের এই আয়োজন যেন তারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দরবেশ রহিম সাধুর মাজারকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে এ ওরস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, কিন্তু মাজারকে ঘিরে এই মিলনমেলার আবেদন কমেনি। বরং মরমি গান, সাধু-সঙ্গ ও ভক্তদের সমাগম এ আয়োজনকে স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক জিয়া বলেন, হাজারো ভক্ত-অনুরাগীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এবারের ওরসও শান্তিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে তারা আশাবাদী। এই আয়োজন মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, মানবিকতা ও মরমি দর্শনের চর্চা আরও বিস্তৃত করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দুইদিনের এ আয়োজন যেন গ্রামবাংলার এক পুরনো ছবিকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে মাটির গন্ধ, বাউলের কণ্ঠ, দোতারার সুর আর মানুষের মিলন। এখানে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনুভব বড়, পরিচয়ের চেয়ে মানুষ বড়।

সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু মানুষের ভেতরের শান্তি খোঁজার আকাঙ্ক্ষা বদলায় না। সাহাপুরের এই ওরস তাই শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি বাংলার লোকজ আত্মা, মরমি সংস্কৃতি ও মানবতার এক চলমান উৎসব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত