বাংলাদেশের কৃষিতে সার সংকট নতুন নয়। কিন্তু এবারের আমন মৌসুম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। দেশে সার আছে, গুদামে মজুদও আছে, তাহলে কৃষক প্রয়োজনের সময় সার পাচ্ছেন না কেন? কৃষকের কাছে সার সময়মতো এবং নির্ধারিত দামে পৌঁছানোই যেখানে মূল কথা, সেখানে শুধু জাতীয় মজুদের হিসাব দিয়ে সংকটের বাস্তব চিত্র বোঝা যাবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬৭.৭ লাখ টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬.২ লাখ, ডিএপি ১৩.৫ লাখ, এমওপি ৯.৭ লাখ, টিএসপি ৯.০১৫ লাখ এবং অন্যান্য সার ৯.২১ লাখ টন। বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি সার কারখানায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১.০৬ লাখ টন, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টন। কারখানাগুলোর স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও গ্যাস সংকট, পুরনো যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতায় উৎপাদন অনেক কমেছে। ফলে সারের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আর আমদানিনির্ভর এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজার, জ¦ালানি মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রা, জাহাজ চলাচল ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। সার সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কৃষি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, খাদ্যনিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এবারের আমন মৌসুমে সারের মজুদ ও চাহিদার হিসাব দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর দেশে সারের চাহিদা প্রায় ১৩.২১ লাখ টন। এর বিপরীতে ৩১ আগস্ট মজুদ ছিল ১৩.৬৫ লাখ টন, অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪৪ হাজার টন বেশি। আবার ১ সেপ্টেম্বর সরকার মোট মজুদ ১২.৮৬ লাখ টন বলে জানিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মজুদ পর্যাপ্ত থাকার পরও প্রয়োজনের সময় কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন? রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, বগুড়া ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের চাহিদামতো সার না পাওয়া এবং বেশি দামে কেনার অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও কৃষকের সার পেতে দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও ডিলারের কাছে সার না পেয়ে কৃষককে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে হচ্ছে, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম সার দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সমস্যা শুধু সারের ঘাটতিতে নয়; বরং বরাদ্দ, উত্তোলন, পরিবহন, মজুদ ও বিতরণের বিভিন্ন ধাপে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সার নিয়ে অসাধুদের এই তুঘলকি নতুন কিছু নয়। দামের ক্ষেত্রেও সমস্যার চিত্র কম উদ্বেগজনক নয়। সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। অথচ বিভিন্ন জেলার মাঠ প্রতিবেদনে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ এসেছে। কোথাও ডিলারের কাছে সার না পেয়ে কৃষককে খুচরা বাজারে যেতে হচ্ছে, কোথাও প্রয়োজনীয় সার মিলছে না, আবার কোথাও মজুদ থাকার পরও সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে এমন দাবি করা যায় না। সার ভর্তুকিনির্ভর পণ্য হওয়ায় সরকারি সহায়তার সুফল যদি সরবরাহব্যবস্থার কোনো স্তরে আটকে যায়, তাহলে রাষ্ট্র অর্থ ব্যয় করেও কৃষক সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। প্রয়োজনের সময় সার না পেয়ে কম ব্যবহার করলে ফলন কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সার ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু গুদামে কত টন সার মজুদ আছে, তা দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
এই জায়গাতেই সার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন। বিচ্ছিন্ন সফটওয়্যার বা কাগুজে হিসাবের বদলে দরকার একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে থাকতে পারে কৃষকের ডিজিটাল সার কার্ড। জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন, মৌসুম, সম্ভাব্য চাহিদা এবং সার গ্রহণের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় থাকলে কৃষক নিজের প্রাপ্যতা জানতে পারবেন। একই সঙ্গে একজন কৃষকের নামে অতিরিক্ত সার উত্তোলন বা কৃত্রিম চাহিদা তৈরির সুযোগও কমবে। ডিলারের অনলাইন স্টক ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ, উত্তোলন, পরিবহন, গুদামে পৌঁছানো, বিক্রি ও অবশিষ্ট মজুদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ থাকলে কোথায় সার আটকে আছে বা অস্বাভাবিক মজুদ হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। কারখানা বা কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে ডিলারের গুদাম পর্যন্ত প্রতিটি চালানও ডিজিটালভাবে অনুসরণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মোবাইল, এসএমএস বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরকারি মূল্য, স্থানীয় মজুদ ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ এবং অতিরিক্ত দাম, কৃত্রিম সংকট, মজুদ গোপন, ওজন কম দেওয়া বা হয়রানির অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে । প্রশ্ন উঠতেই পারে, সার সংকট নাকি এই সংকট নৈতিকতার।
ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি সারের চাহিদা নির্ধারণেও পরিবর্তন জরুরি। এখনো আগের বছরের ব্যবহার, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য ও প্রশাসনিক অনুমানের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। এর বদলে কোন এলাকায় কত জমিতে আমন, বোরো বা অন্যান্য ফসল হয়েছে, ফসলভেদে সার ব্যবহারের পরিমাণ, গত কয়েক বছরের প্রবণতা, আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত এবং বাজারদরের পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে এলাকাভিত্তিক প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ করা যেতে পারে। আরও এগিয়ে এআই ব্যবহার করে এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আগাম চাহিদার পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব। এতে সংকট দেখা দেওয়ার আগেই সরবরাহ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত মজুদ দ্রুত ঘাটতিপ্রবণ এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে। এর সঙ্গে মাটি পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ যুক্ত করা জরুরি। লক্ষ্য হওয়া উচিত বেশি সার দেওয়া নয়, সঠিক ফসলে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ সার নিশ্চিত করা। দীর্ঘমেয়াদে সার সরবরাহের নিরাপত্তার জন্য দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আমদানিনির্ভরতা রাতারাতি কমানো সম্ভব নয়, কিন্তু বিদ্যমান উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত রেখে সেই নির্ভরতা আরও বাড়ানোও যুক্তিসংগত নয়। সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে এসেছে ১১.০৬ লাখ টনে। গ্যাস সংকট এর অন্যতম কারণ হলেও পুরনো কারখানা আধুনিকায়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ¦ালানি মূল্য বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘœ বা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে আমদানি ব্যাহত হলে যাতে কৃষি বিপাকে না পড়ে, সে জন্য আগাম ক্রয় পরিকল্পনা ও কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা দরকার। তবে উৎপাদন ও আমদানি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন, আমদানি, মজুদ ও বিতরণকে একই সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। কারখানা থেকে কৃষকের জমি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য এক ব্যবস্থায় যুক্ত থাকলে কোথায় ঘাটতি, বিলম্ব, অপচয় বা অনিয়ম হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের আমন মৌসুমের অভিজ্ঞতাকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। আজ যে সমস্যা আমনে দেখা দিয়েছে, আগামী বোরো মৌসুমে তা আরও বড় আকারে ফিরে আসতে পারে। তাই নতুন সার ডিলার ও বিতরণ নীতিমালায় শুধু ডিলার নিয়োগের বিষয়টি নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে। ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা, এলাকাভিত্তিক প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ, ডিজিটাল কৃষক পরিচয় ও সার কার্ড, অনলাইন স্টক মনিটরিং, চালানভিত্তিক পরিবহন ট্র্যাকিং, সরকারি মূল্য ও স্থানীয় মজুদ প্রকাশ, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং এআইভিত্তিক চাহিদা পূর্বাভাসকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। জাতীয় মজুদ থেকে জেলা বরাদ্দ, ডিলারের উত্তোলন, গুদামের স্টক এবং কৃষকের সার গ্রহণের তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হলে ‘গুদামে সার আছে’ আর ‘কৃষক সার পাচ্ছেন না’ এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে সমস্যাটি কোথায়, তা স্পষ্ট হবে। তখন সরকারের সাফল্য শুধু কত টন সার আমদানি বা মজুদ করা হয়েছে, তা দিয়ে মাপা হবে না; মাপা হবে কৃষকের কাছে কতটা সার সময়মতো এবং ন্যায্যমূল্যে পৌঁছেছে, তা দিয়ে। কৃষকের গোলায় ফসল ওঠার নিশ্চয়তা তৈরি হয় মাঠেই, আর সেই নিশ্চয়তার অন্যতম শর্ত সারের নিরবচ্ছিন্ন ও স্বচ্ছ সরবরাহ। সার আছে, তবু কৃষক কেন বঞ্চিত, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু গুদামের দরজা নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। আর সেই ব্যবস্থায় সংস্কারের সময় আগামীকাল নয়, এখনই।
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।