ঋণ ও প্রতারণা মানুষের জীবন ও সমাজকে কতভাবে বিরূপ প্রভাবে প্রভাবিত করে এর বহু নজিরই আছে আমাদের সামনে। নীতি কথায় আছে, কেউ যদি কারও সঙ্গে প্রতারণা করতে সফল হয় তবে কখনই ভাবা সমীচীন নয় যে, ব্যক্তিটি বোকা ছিল। বরং এটা মনে রাখা উচিত প্রতারিত ব্যক্তিটি বিশ্বাস করেছিল কিন্তু যে প্রতারণা করল সে বিশ্বাসের যোগ্য ছিল না। এই উত্তম কথাটি সামনে এনেছে ৭ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে “অ্যাপে ‘সহজ শর্তে’ ঋণের টোপ ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল” শিরোনামের প্রতিবেদনটি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছেন হাজারো মানুষ। শুরুতে ভালো ব্যবহার করে সামান্য টাকা ঋণ দিতে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি। পরে মূল টাকার সঙ্গে উচ্চসুদ আদায়ে ওই তথ্যই হয়ে ওঠে প্রতারক চক্রের প্রধান হাতিয়ার। এসব চক্র যে শুধু ঋণ দিচ্ছে তা নয় মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা হাতিয়েও নিচ্ছে।
প্রতারকরা অপকৌশলের কত ফাঁদ পেতে রয়েছে এর ইয়ত্তা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এর পরিসর ছাড়িয়েছে সীমানার বাইরেও। দেশি-বিদেশি মিলে চক্র গড়ে মানুষকে নানা রকম প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে করছে সর্বস্বান্ত। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের প্রতারকরা বেতনভুক্ত বাংলাদেশি ব্ল্যাকমেইলার নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। এসব অ্যাপে একবার সব তথ্য দিয়ে দিলে ঋণ পরিশোধের পরও থেকে যাচ্ছে ব্ল্যাকমেইলে পড়ার ঝুঁঁকি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ না নেওয়ার জন্য সতর্ক করলেও অনেকের মধ্যেই সেই বোধ জাগছে না বিধায় প্রতারকরা তাদের জাল আরও ছড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ পেয়েছে। প্রতারকরা প্রযুক্তির বিকাশকে মানুষ বধের হাতিয়ার করে তুলেছে।
আমাদের সমাজে যেমন সচেতনতার ঘাটতি আছে, এর সমান্তরালে ওঁৎ পেতে রয়েছে নানা অপরাধীচক্র। একদিকে সাইবার নিরাপত্তাহীনতা অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, এই দুই-ই ‘প্রযুক্তি-সন্ত্রাসী’দের জন্য হয়েছে পোয়াবারো। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চক্রগুলো বিশেষ করে নারীকে ব্ল্যাকমেইল করার প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির নামে মানুষকে নিঃস্ব করার কাজে নামিয়েছে। ফেসবুকে কেউ ঋণের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপস ইনস্টল করলেই অনেক ক্ষেত্রে ওই ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চক্রের কাছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গোয়েন্দাদের কাছে এত তথ্য থাকার পরও প্রতারকদের শেকড় উৎপাটনে কেন তারা সক্ষমতা দেখতে পারছেন না? তাদের কি দায় এড়ানোর অবকাশ আছে?
কখনো কখনো প্রতারক চক্রের কাউকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল মিলছে না। অন্যদিকে প্রতারণার শিকার অনেকে প্রতারিত হয়েও মুখ খুলেন না কিংবা অভিযোগ দায়ের করেন না। প্রথমত দরকার সচেতনতা, দ্বিতীয়ত প্রতারিতদের আইনি সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হওয়া। তাদের তথ্য দিতে হবে যথাযথভাবে। প্রতারিতরা আইনি সহায়তা, অভিযোগ দায়ের এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অধিকার ও খোয়া যাওয়া টাকা বা সম্পদ ফিরে পেতে পারেন। কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে। কিন্তু অপরাধীরা যদি ভুক্তভোগী ও আইনি সংস্থাগুলোর দুর্বলতা বুঝে ফেলে তাহলে তাদের মূলোৎপাটন সহজ নয়। সব ভালোই কঠিন, কিন্তু সব মন্দ সহজ এই কথাটি অমূলক নয়। কাজেই প্রতারকদের হাত গুটাতে চাই সমন্বিত প্রয়াস। প্রযুক্তির ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির ব্যাপারে মনোযোগ বাড়ানো দরকার। সরকারি উদ্যোগে সাধারণ নাগরিকদের জন্য মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ব্যাপক প্রচারের বিষয়ে জোর দেওয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, রোগটা গুরুতর তাই টুটকা দাওয়াইয়ে এর উপশম হবে না।