১৫ বছর ধরে কিডনির অসুখে ভুগছে জুঁই, অর্থাভাবে বন্ধ চিকিৎসা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ এএম

মাত্র সাত মাস বয়স থেকে জটিল কিডনি রোগের সঙ্গে লড়াই করা কিশোরী জুঁইয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি; মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে সহায় সম্বল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে আছে পরিবারটি।

মাত্র সাত মাস বয়সে যে শিশুটির জীবন হাসি-খেলায় মুখর থাকার কথা ছিল, সেই বয়সেই জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জুঁই খাতুন। এরপর দেখতে দেখতে প্রায় ১৫ বছর কেটে গেলেও রোগ থেকে মুক্তি মেলেনি তার। একের পর এক হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসার মধ্য দিয়েই বড় হয়ে উঠেছে কিশোরী জুঁই। বর্তমানে সে কিডনিসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যা নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

জুঁই বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের দিনমজুর জুব্বার আলী ও রিনা বেগম দম্পতির মেজ মেয়ে। সে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সহপাঠীরা যখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায় এবং মেতে ওঠে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে, তখন তীব্র অসুস্থতার কারণে ঘরের চার দেওয়ালেই বন্দি থাকতে হয় জুঁইকে। শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটায় এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি তার।

অসুস্থ জুঁইয়ের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত সংকটজনক। তার শরীর ও পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে, প্রস্রাবের থলিতে প্রস্রাব আটকে থাকছে এবং বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ঘটেনি। পাশাপাশি রাতে ঘুমাতে না পারা ও প্রবল শ্বাসকষ্টের কারণে অসহনীয় কষ্টে দিন কাটছে তার।

ভাঙ্গা কণ্ঠে জুঁই জানায়, তার পেট ফুলে গেছে, পেটে ও পেটের পাশে তীব্র ব্যথা হয় এবং সে ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারে না। সুস্থ হয়ে সে আবার সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে চায়, ঘুরতে যেতে চায় এবং স্কুলে ফিরে যেতে চায়। নিজের চিকিৎসার জন্য সে সকলের দোয়া ও মানবিক সাহায্য প্রার্থনা করেছে।

জুঁইয়ের মা রিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, জুঁইয়ের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন থেকেই ও অসুস্থ। তার পেট ও চোখ-মুখ ফুলে যায়, তীব্র পেটব্যথা হয় এবং প্রস্রাবে বারবার সংক্রমণ দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার মূত্রনালিতে (জরায়ুর নাড়ি বলে পরিচিত অংশে) জটিল সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারের সব সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে এবং বর্তমানে অর্থাভাবে প্রায় তিন মাস ধরে মেয়ের চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ। প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে পেট আরও ফুলে যায়; তখন সে বসতে, শুতে বা ঘুমাতে পারে না। এমনকি ছোট্ট একটি শিশুর মতো স্বাভাবিক খাবারও সে খেতে পারছে না। হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো টাকাও এখন তাদের কাছে নেই। মেয়েকে বাঁচাতে সমাজের হৃদয়বান ও বিত্তবান মানুষের সাহায্য চেয়েছেন তিনি।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়েছেন, বিক্রি করেছেন নিজের সামান্য সহায়-সম্পদ। কিন্তু এখন অর্থাভাবে চিকিৎসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম, চাচী লিপি খাতুন ও চাচা শামিম জানান, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার কষ্ট দেখে আসছেন তারা। জমিজমা, গাছগাছালি বিক্রি করে এবং আত্মীয়স্বজনরা মিলে এ যাবৎ চিকিৎসার খরচ জুগিয়েছেন। কিন্তু এখন আর তাদের কোনো সামর্থ্য নেই। বর্তমানে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করা জুঁইয়ের শারীরিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাকে বাঁচাতে সরকার ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী জানান, অসুস্থতার কারণে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুঁই নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না এবং অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও বসতে পারেনি। তিনি প্রত্যাশা করেন, সহৃদয় ব্যক্তিদের সহায়তায় দ্রুত সুস্থ হয়ে জুঁই আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসবে।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন বলেন, অত্যন্ত অসচ্ছল এই পরিবারটির পাশে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যত দূর সম্ভব দাঁড়িয়েছেন। জুঁইয়ের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মোঃ রেজওয়ানুল হক জানান, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি সাধারণ রোগ। এটি দুই ধরণের হতে পারে, যা বায়োপসি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব। রোগটি কম ক্ষতিকারক হলে তা থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব, তবে বেশি ক্ষতিকারক হলে জীবনভর চিকিৎসা চালাতে হতে পারে। তিনি জুঁইয়ের আরোগ্য কামনা করেন।

জুঁইকে চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করতে বা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা সরাসরি যোগাযোগ বা সাহায্য পাঠাতে পারেন। বিকাশ নম্বর: ০১৭৭১-৭৪৫৬০১

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত