জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর অধিবেশনে ভাষণে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বোঝা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহযোগিতা চাইবেন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফর কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক অংশগ্রহণ নয়; বরং এটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং বিশ্বশান্তিতে দেশের জোরালো ভূমিকা তুলে ধরার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।’
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতিসংঘের কর্মসূচি শেষে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা থাকলেও সফরসূচি সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এসব কর্মসূচি বাদ পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর সংখ্যা ৩০-এর কম থাকছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় এড়ানোর লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ৩০-এর কম হবে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে জানাবে। এ ছাড়া সফরের প্রস্তুতি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যু, জলবায়ু ইস্যুসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলবেন। এ ছাড়া দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকার পরিচালনায় কি কি উদ্যোগ নিয়েছেন তা তুলে ধরবেন। পাশাপাশি বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠকের তালিকায় রয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহাবাজ শরিফ, কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। বিশ্বমঞ্চে তার এই অংশগ্রহণ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউ ইয়র্ক সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। সরকারপ্রধান হিসেবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম নিউ ইয়র্ক সফর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন তিনি। সে অনুযায়ী সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ইতিমধ্যে তিনি দায়িত্ব নিয়ে অধিবেশন পরিচালনা করছেন। অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজিত একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠকে কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের নিউ ইয়র্ক সফর হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তিনি সেখানে মাত্র চার থেকে পাঁচ দিন অবস্থান করবেন। ২৫ অথবা ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি নিউ ইয়র্ক ত্যাগ করবেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কিনছে বাংলাদেশ। আপাতত ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে।’
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ট্রাম্পের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রির কথা এক্স পোস্টে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আরেকটি অসাধারণ চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক ক্রয়াদেশের চেয়ে অনেক বেশি।’ নানা আলোচনার মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
গত ৩১ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে বিমান কেনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন এবং খুব শিগগির সাক্ষাতের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বোয়িং কোম্পানির বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তের জন্য তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প এবং বোয়িংগুলো বাংলাদেশের আস্থার মর্যাদা রাখবে বলে মন্তব্য করেন।