ট্রেক উইথ নিশাত আত্মবিশ্বাসের গল্প

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ এএম

এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার। ২০১২ সালের ১৯ মে তিনি এই ইতিহাস সৃষ্টি করেন। কিন্তু তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেই থেমে থাকেননি। বাংলাদেশের মেয়েদের এভারেস্ট জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হাতে নিয়েছেন মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম ট্রেক উইথ নিশাত। সব বয়সী নারীদের পর্বতারোহণে উৎসাহ জোগাতে শুরু করেছেন ‘সুলতানার স্বপ্ন অবারিত’র মতো ব্যতিক্রমী অভিযানের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

উদয়কাঠী : কোন ভাবনা থেকে এভারেস্টের পথে আপনার যাত্রা শুরু হয়?

নিশাত মজুমদার : আমি অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটিগুলো খুব পছন্দ করি। বই পড়ার মাধ্যমে অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যে পরিবারে বড় হয়েছি সেখানে কোথাও যাওয়া বা ঘোরাঘুরির সুযোগ তেমন ছিল না। আমি যখন কলেজে ভর্তি হই তখন হঠাৎ করে একটা সুযোগ আসে। ২০০৩ সালে এভারেস্ট বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের কিছু অগ্রগণ্য মানুষ ঠিক করলেন, তারা সেদিন দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় যাবেন। আমি কীভাবে কীভাবে যেন ওই দলে যুক্ত হয়ে যাই। পাহাড়ে চড়া যে কী জিনিস আমি তার কিছুই জানতাম না। সম্বল শুধু বইয়ে পড়া অভিজ্ঞতা। সেটাই বা আর কতটুকু। ব্যাপারটা আমার কাছে ঘোরার একটা ইভেন্টই ছিল, অন্তত যাওয়ার আগে। সংগঠনটা ছিল বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন। সেই ভ্রমণটাই আমাকে সুযোগ দেয় আমার জীবনকে নতুনভাবে দেখার। আমরা দুদিনে কেওক্রাডং পাহাড়ে উঠেছিলাম এবং একদিনে নেমেছিলাম। সবাই বলেছিল, সেখানে আমি নাকি বেশ ভালো পারফরম করেছিলাম। তারপর থেকে আমি খোঁজখবর রাখতাম পাহাড় নিয়ে কোথায় কী হচ্ছে। ২০০৪ সালে পত্রিকায় একটি সংবাদ দেখলাম, বাংলাদেশ থেকে এভারেস্ট টিম-১ নামে একটা টিম গঠন হয়েছে। সেখানে মেয়েদের মধ্যে ছিলেন নারী পর্বতারোহী সাদিয়া সুলতানা শম্পা। আমি তখন ভেবেছিলাম, ইস, সাদিয়া সুলতানা শম্পার মতো যদি আমিও যেতে পারতাম! আমার খুব ইচ্ছা হলো আমিও পর্বতারোহী হবো। ২০০৬ সালে ইনাম আল হক ঠিক করলেন যে, উনি মেয়েদের একটা দল পাঠাবেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। তাদের সংগঠন বিএমটিসির উদ্যোগ ছিল এভারেস্ট টিম-১। ইনাম আল হক তখন খুঁজছিলেন আগ্রহী মেয়ে, যারা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে যেতে পারবে। তখন আমি যাদের সঙ্গে কেওক্রাডং গিয়েছিলাম, তাদের একজন বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মশরুল আলম মিলন ভাই, তিনি আমাকে ইনাম আল হকের কাছে নিয়ে যান। এভাবেই ইনাম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা, পরিচয়, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে যাওয়া। সেখানে সাদিয়া সুলতানা শম্পা ছিলেন আমাদের টিম লিডার। ফিরে আসার পরে তিনি জানালেন যে, আমি ভালো করেছি বেস ক্যাম্প অভিযানে। তখন আমাকে ভারতের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে পাঠানো হলো প্রশিক্ষণের জন্য। এই প্রশিক্ষণটি স্পন্সর করেছিল বিএমটিসি। প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরার পরে শুরু হলো একের পর এক পাহাড়ে চড়া।

উদয়কাঠী : এভারেস্ট আরোহণের পরে কী মনে হয়েছিল?

নিশাত মজুমদার : এভারেস্ট আরোহণের পরে ভেতরটা একটু ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো। কারণ পর্বতারোহণের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আমি ভাবতাম, সেই যাত্রার হয়তো শেষ দেখে যেতে পারব না। মানে, জীবদ্দশায় আমরা এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করতে পারব সেটা ভাবিনি। ভেবেছি আমরা শুরু করলাম, পরে যারা আসবে তারা এই যাত্রা শেষ করবে। যেই মুহূর্তে চূড়ায় দাঁড়ালাম, মনে হলো, শেষ! তখন আমি জানি না যে, সামনে কি অপেক্ষা করছে। আমার মূল অনুভূতি শুরু হয় দেশে ফেরার পরে। দেশে ফিরে দেখলাম, বহু মানুষ অ্যাপ্রিশিয়েট করছে, বহু মানুষ এয়ারপোর্টে এসেছে। আমি ভাবলাম, এই ভালোবাসা আমার ভেতরে একটা দায়বদ্ধতা তৈরি করে। সেটা থেকেই কিছু ইনিশিয়েটিভ নেওয়া শুরু করি। আমরা ‘অভিযাত্রী’ (অভিযাত্রী একটি সংগঠন, নিশাত মজুমদার সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা) গঠন করি। অভিযাত্রীর মোটো হলো, ইন্সপায়ারিং অ্যাডভেঞ্চারস ইমপাওয়ারিং লাইফস। অ্যাডভেঞ্চারে অংশগ্রহণ বেশি করে তরুণরা। কেউ সাইকেলিং পছন্দ করে, কেউ সুইমিং, কেউ মাউন্টেনিয়ারিং সেগুলো প্রোমোট করাই অভিযাত্রীর লক্ষ্য।

অভিযাত্রী থেকে আমরা নানা কার্যক্রম শুরু করি। আমরা মনে করি শুধু ঘুরে বেড়ালেই হবে না। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশটাও জরুরি। অ-তে অভিযান আমাদের তেমন একটি প্ল্যাটফরম। যেখানে বইপড়া হয়, বই নিয়ে আড্ডা হয়। পাশাপাশি আমরা শোক থেকে শক্তি কার্যক্রম করি প্রতি বছর। যেগুলো আমাদের শেকড়; যেমন আমাদের ভাষা আন্দোলন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসকে অনুসন্ধান ও তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আমাদের এই কার্যক্রমটি। এই কার্যক্রমগুলো নিয়ে আমরা বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছিলাম। কিন্তু তারপরও আমার মনে সেভাবে সন্তুষ্টি আসছিল না। তখন মনে হলো, আচ্ছা, মেয়েদের জন্য কী করা যায়? সে চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে শুরু করলাম ট্রেক উইথ নিশাত। ট্রেক উইথ নিশাতের মোটো হলো, ইম্পাওয়ারিং উইমেন থ্রু দ্য পাওয়ার অব মাউন্টেনিয়ারিং। পর্বতারোহণের মধ্য দিয়ে একজন নারীকে ইম্পাওয়ার্ড করা। ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছরই আমরা এই কার্যক্রমটা করছি। পাঁচ বছর ধরে চলছে। এটা একটা মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম।

উদয়কাঠী : সুনির্দিষ্টভাবে কখন এবং কোন প্রেক্ষাপটে মনে হলো, নারী অভিযাত্রী গড়ে তোলার জন্য কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন?

নিশাত মজুমদার : আমি ২০১২ সালে এভারেস্টে গেলাম। ২০২২ সালে আমি যখন পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, আজ দশ বছর হয়ে গেল আর একটা মেয়েও এভারেস্টে অভিযান করল না বা পর্বতারোহণ করছে না! দু-একজন নারী পর্বতারোহী যে ছিল না, তা না। তবে সংখ্যাটা ছিল অপ্রতুল। যত নারী অভিযাত্রী আমাদের থাকার কথা ততজন নেই মানেই তো আমরা পিছিয়ে আছি। এই চিন্তা থেকে ট্রেক উইথ নিশাত শুরু করা। আমাদের পুরুষ ক্লাইম্বারও কম। সামর্থ্য কম থাকার কারণে আমরা পরিসরটা ছোট করে নিয়ে এসেছি, শুধু মেয়েদের জন্য এবং তাদের বয়স হতে হবে আঠারো থেকে পঁচিশ বছরের মধ্যে। এভারেস্ট আরোহণের প্রস্তুতির জন্য যেহেতু অনেক দিন লেগে যায় সেহেতু আমরা এমন একটা এজ গ্রুপের মেয়েদের বাছাই করতে চাইলাম এই মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের জন্য যেন তারা এভারেস্ট অভিযানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পর্যাপ্ত সময় পায়।

উদয়কাঠী : ট্রেক উইথ নিশাতের বাছাই পর্ব বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। এই ধাপগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বললে তরুণ নারী অভিযাত্রীদের সুবিধা হবে নিজেদের তৈরি করতে।

নিশাত মজুমদার : ট্রেক উইথ নিশাত বাছাই পর্বে সাতটি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপ হলো, গুগল ফরম পূরণ করা। দ্বিতীয় ধাপ হলো, একটা ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা। কেন ট্রেক উইথ নিশাত অভিযানে অংশগ্রহণ করতে চায় সে সম্পর্কে তারা জানায় সেখানে। এটি একটি রেজিস্ট্রেশন প্রসেস। এরপরের ধাপ হলো, ফেস টু ফেস ইন্টারভিউ। এরপর আসে, ফিজিক্যাল ফিটনেসের পরীক্ষা। ফিজিক্যাল টেস্টের মধ্যে থাকে হাঁটা, দৌড়ানো প্রভৃতি। এরপর থাকে স্ট্রেন্থ টেস্ট। যেমন ১৭ কেজি ভার নিয়ে বিশ কিলোমিটার হাঁটা। এরপরের ধাপে আমরা মেয়েদের নিয়ে পাহাড়ে যাই। সেখানে তারা হাতেকলমে পাহাড়কে জানে। পর্বতারোহণ তো একটা টিমওয়ার্ক। সে টিম মেম্বার হিসেবে কেমন, কতখানি ডেডিকেটেড মানুষ, কতখানি হেল্পফুল, শারীরিক সক্ষমতা কেমন আছে এগুলো সেখানে যাচাই হয়ে যায়। প্রায় দুদিনব্যাপী ১৫ কেজি ভার নিয়ে পাহাড়ে উঠতে হয়। ক্যাম্পিং করতে হয়। নিজেদেরই রান্না করতে হয়। ক্যাম্প সেট করতে হয়, ক্যাম্প ক্লিন করতে হয়। এটাই অগ্নিপরীক্ষা। এখান থেকেই বের হয়ে যায় আমাদের নেক্সট মেন্টি কে হচ্ছেন। এরপর সামান্য কিছু অ্যাসেসমেন্ট থাকে। ফিজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট, মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট হয়। আমরা একটা বই পড়তে দিই ‘ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি’। সেটার একটা পরীক্ষা হয়। সব মিলিয়ে বের হয় কে এবারের ট্রেক উইথ নিশাত অভিযানের মেন্টি হচ্ছেন।

উদয়কাঠী : ট্রেক উইথ নিশাত কার্যক্রমের কোন বিষয়টি আপনাকে কার্যক্রমটি চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে?

নিশাত মজুমদার : ট্রেক উইথ নিশাতের বাছাই পর্বে দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে অংশগ্রহণকারীরা আসে। লালমনিরহাট থেকে, টেকনাফ থেকে। পাহাড়ে যাব, পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত হব ওদের এই অনুভূতিটা আমি ওদের চোখে মুখে দেখতে পাই। এটা আমাকে খুব ইন্সপায়ার করে। প্রথম যে মেয়েটাকে আমরা মেন্টি হিসেবে নিলাম, ও ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তারি পড়ে। নিশ্চিতভাবেই সে বাংলাদেশের সেরা ছাত্রদের একজন। কোনো কিছুর অভাব তার ছিল না। ও যখন বেস ক্যাম্প থেকে ফিরে এলো তখন বলল, এতদিন জানতাম না আমি জীবনে কী চাই, কেন চাই, কীভাবে চাই। কী করছি, কেন করছি তাও জানতাম না। এখন আমি জানি, আমি জীবনে কী চাই। এটা শোনার পরে আমার মনে হয়েছে, হ্যাঁ, এই প্রোগ্রাম হয়তো সাকসেসফুল হয়েছে। আমাদের যে অ্যাসেসমেন্টগুলো আছে সেগুলোতে অংশগ্রহণের ফলে মেয়েগুলো জানছে তাদের সক্ষমতা। এবারে আমাদের এই প্রোগ্রামে পঁচানব্বইটি মেয়ে আবেদন করেছিল। তৃতীয় ধাপটি হলো, ১৭ কেজি ভার নিয়ে বিশ কিলোমিটার হাঁটা। এই প্রক্রিয়াটি শেষ করেছিল সাতটি মেয়ে। তারা জানতই না যে, তারা ১৭ কেজি ভার নিয়ে বিশ কিলোমিটার হাঁটতে পারে। সেটা এখন তারা জানে। সে কারণে যে মেন্টি হচ্ছে শুধু সে না, যারা অংশগ্রহণ করছে তারা প্রত্যেকেই নিজেদের সম্পর্কে নতুন কিছু জেনে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছে। এই যে নিজেকে জানা, নিজের সক্ষমতাকে জানা, এটাই হলো সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। সর্বশেষ ধাপে হয়তো একজন যাচ্ছে, তবে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে জয়ী। যে কখনো ভাবেনি এমন একটি কার্যক্রমে অংশ নেবে সে জয়ী কারণ সে তার বৃত্তটি ভাঙতে পেরেছে। যে ওই অ্যাসেসমেন্টটা অতিক্রম করল সে জানল, বাধা পেরোনোর শক্তি তার নিজের মধ্যেই আছে। যে অ্যাসেসমেন্টটা পার হতে পারেনি সে হয়তো ওই ধাপ অতিক্রম করতে পারল না, কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সাহসিকতা দেখাল। এটাও একটা জয় বটে। এ জন্য আমরা বলি, ট্রেক উইথ নিশাতে কোনো পরাজয় নেই। সবাই জয়ী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত