খেলাপিদের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের বৈঠক, ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ আদায়ের লক্ষ্য

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ এএম

খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান বৈঠক করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকের বিরুদ্ধে চলমান মামলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের জন্য খেলাপি গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না বলে জানানো হয়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর দিলকুশায় জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তিন পরিচালক আব্দুল মজিদ, আব্দুল আওয়াল সরকার ও খন্দকার মামুন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মজিবুর রহমান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং মহাব্যবস্থাপকরা (জিএম) উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে ২৯ জন খেলাপি গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন ব্যাংকের ঋণ আদায়-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, বকেয়া ঋণের পরিমাণ এবং মামলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় যেসব পুনঃতফসিল ও ঋণ আদায়-সংক্রান্ত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোও গ্রাহকদের জানানো হয়।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকে ২৯ জন খেলাপি গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে। তাদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করলে তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ থাকবে না। তখন আমরা আরও কঠোর ব্যবস্থা নেব। আশা করি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভালো আদায় সম্ভব হবে।’

ব্যাংক সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি বসে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং যারা ঋণ পরিশোধে আগ্রহী, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা আদায় নিশ্চিত করে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সমঝোতার সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্তই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া নেওয়া হচ্ছে না।

ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, খেলাপি গ্রাহকদের সঙ্গে ‘রিকভারি হেড-টু-হেড’ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, কার ঋণ আদায়ের বাস্তব সুযোগ রয়েছে এবং কে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করছেন না—তা আলাদা করা। যারা ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক খেলাপি গ্রাহকের ঘটনাও ব্যাংকের ঋণ আদায় কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। রিয়েল এস্টেড এ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন রিহ্যাবের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলীর একটি প্রতিষ্ঠানে তার ছেলের নামে ঋণ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ঋণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরে দুই দফায় সুবিধা এবং চারবার সময় বৃদ্ধির সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এবার ওই ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষ করে ভবিষ্যতে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই ঋণ পরিশোধে তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ ধরনের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য হচ্ছে, বারবার সময় বৃদ্ধি বা সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে এবার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকৃত অর্থে ঋণ আদায় করা। এ কারণেই খেলাপিদের সঙ্গে সরাসরি বসে তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও পরিশোধ পরিকল্পনা জানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ২৯ জন গ্রাহকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হবে। যারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করবেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও ব্যাংকের পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালার ফলে খেলাপি ঋণের গ্রাহকদের এককালীন ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে সুদ মওকুফের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় ব্যাপক হয়েছে। যদিও এ ধরনের সুবিধা নতুন নয়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সীমিত পরিসরে এ ধরনের নীতিমালা দেওয়া হয়েছিল। নতুন নীতিমালায় মূলত আগের ব্যবস্থাগুলোকেই আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।

তাদের মতে, আগ্রাসী ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো যে বড় ধরনের ঋণঝুঁকি তৈরি করেছে, পরবর্তী সময়ে সুদ মওকুফের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি করাকে এক ধরনের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাদের আচরণ ও খেলাপির কারণ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সুদ ছাড় দিয়ে শুধু আসল টাকা আদায়ের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক। কারণ, এসব ঋণের গ্রাহকদের একটি বড় অংশ সাধারণত ঋণ পরিশোধে আন্তরিক এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা ঋণ শোধের চেষ্টা করেন। বড় ঋণগ্রহীতা বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের মতো ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতাও এ শ্রেণির গ্রাহকদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত