সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) সনদপ্রাপ্ত আলেম, হাফেজ ও কারিদের আলিয়া মাদ্রাসায় শর্তসাপেক্ষে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ কর্তৃক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তারা আলিয়া মাদ্রাসার সর্বনিম্ন গ্রেডে সহকারী মৌলবি ও ইবতেদায়ি কারি পদে নিয়োগ পাবেন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়োগের শর্ত ও কাম্য যোগ্যতা ২০১৮ সালের ৪৮ নম্বর আইনের পরিপন্থি এবং বৈষম্যমূলক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এমপিও শাখা কর্তৃক ২৩ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (আলিয়া মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৬’ সহকারী মৌলবি (কারি) ও ইবতেদায়ি কারি নিয়োগের কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত পরিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। উভয় পদে কাম্য সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (আলিয়া) থেকে দাখিল (মুজাব্বিদ) আলেম (মুজাব্বিদ মাহির) এবং সরকার স্বীকৃত যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাজিল অথবা সরকার স্বীকৃত যেকোনো শিক্ষাবোর্ড থেকে ইলমে কিরাত বা হাফেজে কোরআন উত্তীর্ণ সনদসহ সরকার স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাজিল, অনার্স অথবা আল হাইয়াতুল উলয়ালিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ থেকে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিসহ ৬টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে ইলমে কিরাত, হিফজুল কোরআন সনদ থাকলে উক্ত পদে এনটিআরসিএ-এর যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে নিবন্ধন হতে হবে।
নিবন্ধন পরীক্ষা তিনটি ধাপে হয়ে থাকে। প্রাথমিক ধাপে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান ১০০ নম্বরের এমসিকিও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে, যে বিষয়ের শিক্ষক হতে আগ্রহী, ওই বিষয়ে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এসব পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবেন, তাদের তৃতীয় ধাপে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণদের মেধা তালিকা করে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে এনটিআরসিএ শূন্য পদের জন্য তালিকাভুক্তদের অনলাইনে আবেদন করার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে তখন চাকরি প্রার্থীদের মেধা তালিকায় সর্বাধিক যোগ্য বলে যারা বিবেচিত হবেন, ধারাবাহিকভাবে তাদেরই শূন্য পদে নিয়োগের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের পদ শূন্য রয়েছে সে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করবেন। প্রতিযোগিতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সাধারণত যেসব সাধারণ বিষয়ে পরীক্ষায় আলিয়া ও জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত তারা নিবন্ধন পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে থাকেন। বর্তমান প্রক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষিতদের সাধারণ বিষয়ের ফলাফলে অকৃতকার্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেখা গেল, দশ হাজার কওমি আলেম এনটিআরসিএ-এর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে খুব কম সংখ্যক পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেন। পরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সবখানে। এর মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে।
যেহেতু এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ একটি প্রতিযোগিতামূলক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে কওমি শিক্ষা কারিকুলাম একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থা। অন্যদিকে সহকারী মৌলবি কারি ও ইবতেদায়ি কারি পদটি বেতন স্কেল ও গ্রেড নতুন নিয়োগ বিধি অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ও গ্রেডানুযায়ী সর্বনিম্ন স্তরের। এমতাবস্থায় মাস্টার্স ডিগ্রি সমমানসম্পন্ন কওমি আলেম, হাফেজ, কারি এ পদে যোগদান করলে তাকে ওই পদেই চাকরি জীবন শেষ করতে হবে। কারণ ওই পদ থেকে পেশাগত পদোন্নতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা ও বেতন খুবই বৈষম্যমূলক। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দেওয়া হলেও কওমি আলেমদের সহকারী মৌলবি-কারিদের গ্রেড-১১ ও ইবতেদায়ি কারিদের গ্রেড-১৬ বেতন স্কেলও অমর্যাদাকর। এতে প্রতীয়মান হয়, রাষ্ট্র কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু সমমর্যাদা দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় আলিয়া মাদ্রাসার সমমান হওয়ার পরও আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ পদে কওমি আলেমদের কোনো সুযোগ প্রদান হয়নি। এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ একটি প্রতিযোগিমূলক ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া। কওমি আলেমদের যদি এই ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে হয় তাহলে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের মতো বিষয়গুলো পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের মূল বিষয়ে পরিগণিত হবে। শুধু চাকরি লাভের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে হলে দ্বীনি ইলমের যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাবে। এমতাবস্থায় কওমি মাদ্রাসার উচ্চতর শ্রেণিতেও সাধারণ বিষয়ের পরিধি ও ক্রমশ চাপ বাড়ানোর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তখন কওমি মাদ্রাসার ঐতিহ্যগত ধারাবাহিক নিজস্ব নেসাবের ওপর সাধারণ শিক্ষার প্রভাব পড়বে এবং কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতির বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কওমি সনদের অবমূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটবে। কওমি মাদ্রাসা একটি নিঃস্বার্থ ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা। যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলোÑ ইসলামি জীবনদর্শন, মূল্যবোধ ও আল্লাহর বিধান মেনে চলার অভ্যন্তরীণ তাড়না ও অনুভূতিসম্পন্ন একনিষ্ঠ ইসলাম প্রচারক তৈরি করা।
আলিয়া মাদ্রাসার সহকারী মৌলবি (কারি) ও ইবতেদায়ি কারি নিয়োগের পরিপত্রটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮’-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়। কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতদের আমরা সরকারি চাকরিতে দেখতে চাই, কিন্তু অবমূল্যায়নের স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়। শিক্ষাধারাকে ছোট করে নয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শ, মূলনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। আমরা আশা করি, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা বোর্ডসমূহের দায়িত্বশীলরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তরিক হবেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিপত্র ও আইনের ধারাগুলো যাচাই-বাছাই করে করণীয় নির্ধারণ করবেন।
লেখক: সভাপতি, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ