ক্লাব ক্রিকেটে নতুন জট

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১২ এএম

জট বাঁধিয়েই সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ক্রিকেট বোর্ডকে কার্যত অকার্যকর করে রাখে ৪৩ দলের একটি জোট। তখন ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিসের (সিসিডিএম) অধীনে কোনো লিগেই অংশ নেয়নি তারা। মূলত বুলবুলের বোর্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সেটাই অন্যতম বড় শক্তি ছিল তাদের। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে নতুন বোর্ডে তারাই এখন দায়িত্বের বিভিন্ন চেয়ারে বসেছেন। সেই পুরনো জটিলতাও আর নেই। তবে নতুন করে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে সংকট তৈরি হয়েছে।

ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল) নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বোর্ড-ক্লাবের মধ্যে। লিগের প্রতিযোগিতা বাড়াতে ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েস’ পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে চায় সিসিডিএম। কিন্তু সেই প্রস্তাবে আপত্তি অধিকাংশ ক্লাবের। ক্লাবগুলোর বড় অংশের যুক্তি  ক্রিকেটারদের গ্রেড করে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দিলে দল গঠনের স্বাধীনতা যেমন থাকবে না, তেমনি সীমিত বাজেটের ক্লাবগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। অন্তত চারটি ক্লাবের প্রতিনিধিরা জানান, প্লেয়ার্স বাই চয়েসের প্রক্রিয়া ফিরে এলে তারা এবার লিগে অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্তও নেবেন।

সিসিডিএম অবশ্য ক্লাবগুলোর আপত্তির চেয়ে প্রিমিয়ার লিগের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই বিভাগের চেয়ারম্যান মঈনুদ্দিন চৌধুরী কামরু বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ কীভাবে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা যায়। এখন ১২ দলের মধ্যে ১২টা দল সমমানের হয় না। এতে প্রতিযোগিতার মান থাকে না। প্রিমিয়ারের লিগ মর্যাদার জায়গা। এখানে খেলতে হলে তো তেমন মানেরই দল করতে হবে। বোর্ড শতভাগ সমর্থন দিচ্ছে। গতবার অনুদানের অর্থও বাড়ানো হয়েছে।’

অনুদান, জার্সি, আসা-যাওয়া এবং পুরস্কার মিলিয়ে ডিপিএলে অংশ নেওয়া একটি দল সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ ও সর্বনিম্ন প্রায় ৩২ লাখ টাকা করে পায়। কিন্তু সিসিডিএম মনে করছে, এত অর্থ ব্যয় করার পরও লিগে প্রতিযোগিতা বাড়ছে না। বেশ কয়েকটি দল খুব শক্তিশালী দল গড়লেও অনেকেই সে পথে হাঁটছে না। যেমন গতবারের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান দল গড়তে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা খরচ করে। প্রাইম ব্যাংক, আবাহনী লিমিটেডের মতো শিরোপার লড়াইয়ে নামা দলগুলো ৩ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। তবে সিটি ক্লাব, লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের খরচ হয়েছে দেড় কোটি টাকার মতো। একই মালিকানার দুই দল গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স ও রূপগঞ্জ টাইগার্স ক্রিকেট ক্লাব দুটি দল তৈরিতে সব মিলিয়ে দেড় কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।

এবার প্লেয়ার্স বাই চয়েস পদ্ধতি ফিরিয়ে সব দলকে সমমানের করতে চায় সিসিডিএম। এ জন্য ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ও মান বিবেচনায় বিভিন্ন গ্রেডে ভাগ করা হতে পারে। এরপর প্রতিটি গ্রেডের জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক ঠিক করে সেই কাঠামোর মধ্যেই দল গঠন করবে ক্লাবগুলো। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা ও স্পনসর সংকটে এই প্রস্তাবে রাজি নয় বেশ কয়েকটি ক্লাব। প্রিমিয়ার লিগের একটি দলের একজন কাউন্সিলর বলেন, ‘বেশি টাকা খরচ করলেই কি মান বেড়ে যাবে! মান বাড়াবে ক্রিকেটাররা। তারা পারফর্ম না করলে মান বাড়বে কীভাবে! এখন বোর্ড যদি সবসময় ক্রিকেটারদের কথা চিন্তা করে, কোয়াবের (ক্রিকেটারদের সংগঠন) কথা চিন্তা করে, তাহলে আমাদের ডেকে আর কী হবে। এভাবে তো আমরা খেলতে পারব না।’

মোটা অঙ্কের শক্তিশালী দল গড়লেও খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক শোধ করতে পারেনি মোহামেডান। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান চলতি মাসে দুই দফা ঘুরিয়েও টাকা দেয়নি। এতে কর্মকর্তারা নিজেদের থেকে এক কোটি টাকা পরিশোধ করলেও এখনো এক কোটি ৬২ লাখ টাকা বাকি বলে জানান ক্লাবের একজন কর্মকর্তা। এমন অবস্থায় নতুন করে স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন বলেই মনে করছেন তিনি। তার ওপর কোয়াব নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে পারিশ্রমিকের একটি তালিকাও তৈরি করে ফেলেছে। যেখানে সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির একজন ক্রিকেটারের পারিশ্রমিক ধরেছে ৫০-৬০ লাখ টাকা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্লাব কর্মকর্তা বলেন, ‘এভাবে দল করতে গেলে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা খরচ আছে। এখন দল চালাতে হয় নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে। যারা এখন এসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন প্লেয়ার্স বাই চয়েস করবেন, তারা ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট নিয়ে কত বছর কাজ করেছেন।’

গাজী গ্রুপের এক কর্মকর্তা আরও বড় হুঁশিয়ারি দেন, ‘এটা আমাদের জন্য খুবই কঠিন। আমরা খুবই বাজে অবস্থায় আমাদের ক্রিকেটটা চালাচ্ছি। এখন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া যায় না। এমন বাজে অবস্থা যে, কেউ ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের জন্য টাকা ঢালতে রাজি নয়। এর মধ্যে এখন যদি খেলোয়াড় বাছাইয়ের নির্ধারিত পদ্ধতি চালু করে, তাহলে আমাদের অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। যেদিন বৈঠকের জন্য ডাকবে এবং এ সিদ্ধান্ত অটল থাকবে, সেদিনই না খেলার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব আমরা।’

তবে ভিন্নমতও আছে। অর্থ সংকটে ভোগা আরেক ক্লাব আবাহনী লিমিটেড প্লেয়ার্স বাই চয়েসে রাজি হলেও ক্লাবগুলোর বর্তমান অবস্থান উল্লেখ করে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কিছুটা কমানোর পক্ষে। এ ক্লাবের অন্যতম পরিচালক জালাল ইউনুস আর্থিক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, ‘আবাহনীর আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। আমরাও চিন্তার মধ্যে আছি এবার কীভাবে দল বানাব। তাই যত কম খরচে দল করা যায়, আবাহনীর অবশ্যই সেই চিন্তাধারা আছে। তবে এটাও সত্য যে, আমাদের খেলোয়াড়রা যে লেভেলে খেলছে, তারা সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য। তাদেরও যেন ক্ষতি না হয়, এসব চিন্তাভাবনা করে বাজেট কিছুটা কমানো যায়, তাহলে ভালো হয়।’

আগামী মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ ফেব্রুয়ারিতে শুরু করার পরিকল্পনা করেছে সিসিডিএম। এই টুর্নামেন্ট সামনে রেখে খুব দ্রুতই ১২টি ক্লাবের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবে তারা। সেখানে প্লেয়ার্স বাই চয়েসের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এবার লিগে বিদেশি ক্রিকেটার ফেরানোর প্রস্তাবও দেবে। জানা গেছে, প্রতি দলে সর্বোচ্চ ১ জন করে বিদেশি মাঠে নামতে পারবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত