বাংলাদেশের বিখ্যাত বনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বন হলো সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যান এবং অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। দেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এটি অন্যতম। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়ার অবস্থান। ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এ বনটি জীববৈচিত্রে ভরপুর।
বর্তমানে এ বনে রয়েছে উল্লুক, মেছো বিড়াল, লজ্জাবতী বানর, সিংহ বানর, চমশাপড়া হনুমান, খাটাশ, বনবিড়াল, বনরুই, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, বনমোরগ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচরসহ অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল এবং প্রজননক্ষেত্র।
চিরহরিৎ লাউয়াছড়া বনের বুক ছিড়ে বহমান আখাউড়া-সিলেট রেল সেকশন ও শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ-শমসেরনগর-ব্রাহ্মণবাজার-কুলাউড়া সড়কপথ। প্রতিদিন রেলপথে ৬ জোড়া যাত্রীবাহী আন্তঃনগর ট্রেনসহ তেলবাহী ট্রেন, মালবাহী ট্রেন এ বনটির মাঝ দিয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলাচল করে। আর সড়কপথে বাস, ট্রাক, জিপ, সিএনজি অটোরিকশা, পর্যটকবাহী গাড়িসহ প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক যানবাহন বনের অভ্যন্তর দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তর দিয়ে বহমান সড়ক ও রেলপথে দ্রুতগতির ট্রেন ও যানবাহনের চাকায় কাটা পড়ে প্রতি প্রতি বছর মারা যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণী মৃত্যুর এ ভয়াবহ খেলা চলমান দীর্ঘদিন ধরে। কোনভাবেই বন্যপ্রাণীর এ মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। শুধু বন্যপ্রাণীই নয়, বনের ভেতরে সড়কপথে ও রেললাইনে প্রতি বছরই পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসুরাও মৃত্যুবরণ করছেন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্র জানায়, যেহেতু লাউয়াছড়া বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রেলপথ ও সড়কপথ সরানো অনেক সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ সেহেতু এ বনের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার করার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষককে একটি চিঠি পাঠান বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তৎকালীন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বুক চিরে যাওয়া রেলপথে বিকট শব্দে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, প্রজনন ও চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বন্যপ্রাণীর চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রেন লাইনে সর্বোচ্চ গতি বর্তমান অবস্থা থেকে হ্রাস করে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখা দরকার।’ পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি (বিভাগীয় বন কর্মকর্তা) লাউয়াছড়া বনের অভ্যন্তরে ট্রেনের গতি কমানোর ব্যাখ্যা দিয়ে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক বরাবরে আরেকটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার দেরাদুনে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার ওপর পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সে প্রশিক্ষণের সময় কোর্সের অংশ হিসেবে তিনি রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক পরিদর্শন করেন। দেরাদুন থেকে হরিদুয়ার-ঋষিকেশ যাওয়ার পথে রাজাজি ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরে রেললাইনে ট্রেনের গতিসীমা সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার রাখা হয়েছে। ন্যাশনাল পার্কের হাতি, বাঘ, হনুমান, বানর, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর জীবন রক্ষার্থে যাত্রীবাহী ট্রেন সেখানে ২০ কিলোমিটার গতিতে চলেছে। হাতি ও বাঘের সঙ্গে কোনো প্রকার সংঘর্ষ এড়াতে ট্রেনচালকেরাও খুবই সচেতন। এই ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরে বন্যপ্রাণীর নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকিয়ে ট্রেনচালক ও পরিচালক ভারতে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় স্বার্থে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে ট্রেনের গতি হ্রাস করে ভারতের মতো ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।’ এ দুটি পত্র প্রেরণের পর ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৯ জানুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. তৌফিক ইমাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক বরাবরে প্রদান করা হয়।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রেললাইনে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুরোধ ও এদের জীবনযাত্রা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে বিদ্যমান রেলওয়ে দিয়ে চলাচলকারী সব ট্রেনের গতিসীমা ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।’ এরপর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একাধিকবার রেলওয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি।
এদিকে ২০২২ সালের ৩ মার্চ ‘বিপন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষা করি, প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসি’ এ প্রতিপাদ্য বিষয়ে যানবাহনের চাকায় কাটা পড়ে বন্যপ্রাণী মৃত্যুরোধে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সড়কপথে সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করে দেয় বন বিভাগ। সেদিন বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উপলক্ষে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ শ্রীমঙ্গল থেকে কমলগঞ্জের ভানুগাছ পর্যন্ত সড়কে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুরোধে এই গতি নির্ধারণ করে। সড়কের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সাত কিলোমিটার জায়গার বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে ‘২০ গতিসীমা’ লেখা সাইনবোর্ডও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন সড়কে এ ঘোষণার কিছুটা বাস্তবায়ন হলে ধীরে ধীরে তা আগের অবস্থাতেই চলে যায়। বন বিভাগের এ ঘোষণা অর্থাৎ সড়কপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিসীমা এ সড়কে চলাচলকারী কোন যানবাহনের চালক মানছেন না।
এ ব্যাপারে টুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা গাড়ির গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে চেকপোস্ট করছি। এছাড়া আমরা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে অতি সচেতনতামূলক বৈঠক করেছি। আমরা সবাই একসাথে যদি কাজ করি তবে আমি আশাবাদী লাউয়াছড়ার বন্যপ্রাণী মৃত্যু রোধ করা যাবে।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘লাউয়াছড়ায় প্রায়ই সড়কের উপর বন্যপ্রাণীর রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি। যা দেখে আমাদের অত্যন্ত খারাপ লাগে। এভাবে গাড়ি চাপায় বন্যপ্রাণীদের নিহত বা আহত হবার ঘটনা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ট্রেনের গতিসীমার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আর সড়কের গতিসীমার নিয়ে সওজের পক্ষ থেকে ২০ কিলোমিটার গতিসীমার সাইনবোর্ড লাউয়াছড়ার বিভিন্ন স্থানে লাগানো রয়েছে। এটি কাউকেই মানানো যাচ্ছে না। সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিসীমা বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় লোকজন, সংশ্লিষ্ট যানবাহনের যাত্রীসহ সকলের ঐকান্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন। যার যার অবস্থান থেকে যানবাহনের চালকদের সচেতনতার জন্য কাজ করলে ইনশাল্লাহ আমরা আশাবাদী সবাই গতিসীমার বিষয়টি মান্য করবেন। এতে বন্যপ্রাণীদের বনে চলাচল হবে নিরাপদ।’
নতুন গতিসীমা বাড়াবে দুর্ঘটনা!