আসিয়ান কাপে অভিষেক হলো বাংলাদেশের। কিন্তু তা মধুর নয়, তিক্ততার। ফিফা র্যাংকিংয়ের পার্থক্যও মাঠের খেলায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। র্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়ার অবস্থান ১৩৬, বাংলাদেশের ১৮১। দুই দলের মধ্যে ব্যবধান ৪৫ ধাপ। শুক্রবার জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছে লাল-সবুজের দল। প্রথমার্ধে দুই গোল হজমের পর দ্বিতীয়ার্ধেও রক্ষণ সামলাতে পারেনি বাংলাদেশ। বিপরীতে কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোলের দেখা পায়নি দলটি।
এই ম্যাচের মাধ্যমে লাল-সবুজের জার্সিতে অভিষেক হয় ইংল্যান্ড প্রবাসী ফারহান আলী ওয়াহিদের। ইন্দোনেশিয়ায় দলের সঙ্গে পাঁচ দিন অনুশীলন করা ফারহানকে একাদশে রাখাই ছিল ডুলির চমক। তবে বাংলাদেশের নিয়মিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে একাদশে রাখেননি কোচ টমাস ডুলি। বাংলাদেশের আর্মব্যান্ড ছিল সিনিয়র সোহেল রানার হাতে। এছাড়া নিয়মিত গোলরক্ষক মিতুল মারমার পরিবর্তে মেহেদী হাসান শ্রাবণকে একাদশে সুযোগ দিয়েছিলেন। অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তপু বর্মণ ইনজুরির জন্য জাকার্তায় যেতে পারেননি। তাই কোচ ডুলি সাদ, জুনিয়র তপু, তারিক ও জায়ানকে দিয়ে ডিফেন্স লাইন সাজান। জাকার্তা গেলেও ইনজুরির জন্য খেলতে পারেননি মোরসালিন।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে। কিন্তু লাল-সবুজের ছন্নছাড়া রক্ষণভাগ মালয়দের সেই আক্রমণ রুখে দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। তাই জুটেছে এমন হার। ম্যাচের মাত্র চতুর্থ মিনিটেই গোলের সুযোগ তৈরি করে মালয়েশিয়া। কর্নার থেকে আসা বলে শট নিলেও গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণ তা রুখে দেন। এরপরও আক্রমণের ধার কমায়নি তারা। ১৮ মিনিটে প্রথম গোল হজম করে বাংলাদেশ। মাঝমাঠ থেকে সতীর্থের বাড়ানো বল নিয়ে বাংলাদেশের বক্সে ঢুকে পড়েন মালয়েশিয়ার ফরোয়ার্ড আরিফ আইমান। বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের বাধা পেরিয়ে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। তার গোলে এগিয়ে যায় মালয়েশিয়া।
গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। ৩৩ মিনিটে সাদ উদ্দিনের পাস থেকে সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের চাপে রাকিব হোসেন শট নিতে পারেননি। মিনিট চারেক পর আবারও রক্ষণভাগের ভুলে গোল হজম করে বাংলাদেশ। সেন্টার-ব্যাক পজিশন থেকে বল সামনে বাড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েন শাকিল আহাদ তপু। তার ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন আরিফ আইমান। গোলরক্ষক মেহেদী হাসানকে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। তাতে প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
বিরতির পর একাদশে দুটি পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি। ফারহান আলী ওয়াহিদ ও ফাহমিদুল ইসলামকে তুলে মাঠে নামানো হয় শাহরিয়ার ইমন ও শুকি ইতোফুসাকে। পরিবর্তনের পর আক্রমণে কিছুটা গতি দেখা গেলেও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। উল্টো ৫২ মিনিটে আরও একটি গোল হজম করতে হয় দলকে। মালয়েশিয়ার ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত ফরোয়ার্ড বার্গসন গুস্তাভো বল পেয়ে দ্রুত ঘুরে ডান পায়ের শটে জালে পাঠান। তাতে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০।
এরপর বাংলাদেশ দলে আরও দুটি পরিবর্তন আনা হয়। তারিক কাজী ও শমিত সোমের বদলে মাঠে নামেন শেখ মোরসালিন ও জিদান ইউসুফ। এই ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় জিদানের। একই ম্যাচে লাল-সবুজের জার্সিতে প্রথমবার খেলেন ফারহান আলী ওয়াহিদ ও শুকি ইতোফুসাও। শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় টমাস ডুলির দলকে। ম্যাচে বাংলাদেশের রক্ষণভাগে একাধিক ভুল দেখা গেছে। আক্রমণেও ছিল না প্রত্যাশিত ধার।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের কোচ ডুলি দুই দলের পার্থক্য নিয়ে বলেন, ‘অবশ্যই আজকের ফল আমাদের স্বপ্নের মতো নয়। তবে এই ম্যাচে বাস্তব চিত্রটা হলো, নির্ভুলতা, টেকনিক ও কৌশলে দুই দলের পার্থক্য পরিষ্কার হয়েছে। র্যাংকিংয়ে তারা এতটা এগিয়ে থাকার পেছনে কারণ আছে।’ মালয়েশিয়ার দ্রুতগতির ও বিপজ্জনক আক্রমণভাগের প্রশংসা করলেও নিজের দলের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি ডুলি। তার মতে, অনেক খেলোয়াড়ই সাম্প্রতিক সময়ে ঘরোয়া লিগে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়ায় পুরোপুরি ম্যাচ ফিট ছিলেন না। কোচ বলেন, ‘খেলোয়াড়দের বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। তারা সবাই চেষ্টা করেছে। কিন্তু আজ আমরা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছিলাম এবং সেই পার্থক্যটা দেখতে পেয়েছি। আমাদের এখান থেকে শিখতে হবে।’
দলের ভারসাম্য ধরে রাখতে হামজা চৌধুরীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কথাও স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ কোচ। ডুলির ভাষায়, ‘আমাদের পেছনে হামজাকে দরকার, মাঝমাঠেও তাকে দরকার। আজ দেখা গেছে, সামনেও আমাদের তাকে প্রয়োজন হতে পারে।’ গোলরক্ষক শ্রাবণের পাশেও দাঁড়ালেন ডুলি। তার মতে, এই পরাজয়ের জন্য শ্রাবণকে দায়ী করা যায় না। দ্বিতীয়ার্ধে ফারহানের বদলে মাঠে নেমে আক্রমণে গতি যোগ করা ইতোফুসারও প্রশংসা করেন তিনি। সামনে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য বাংলাদেশের। ডুলি বলেন, ‘মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মানের পার্থক্য আমাদের মেনে নিতে হবে। এখন আমরা সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে খেলব। সেখানে আরও ভালো করার চেষ্টা করব। এরপর ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে একটি ভালো ম্যাচ খেলার চেষ্টা থাকবে।’
আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের পরের ম্যাচ ২৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের আরেক প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়া। প্রথম ম্যাচের হার ভুলে পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য থাকবে লাল-সবুজের দলের।