সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল রবিবার বেলা ১১টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ থানার সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন প্রায় ১০০ জন নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীরা জানান, ভেরিফিকেশন বা পুলিশি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পর তারা আর নিয়োগপত্র পাননি। আগামী ১ অক্টোবর অন্যান্য নির্বাচিত প্রার্থীর সঙ্গে তারাও চাকরিতে যোগ দিতে চান।
এদিকে আন্দোলনরতদের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য। তারা কেউ কোনো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন, দেশবিরোধী কোনো কার্যকলাপেও যুক্ত নন কিংবা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারপরও ভেরিফিকেশন নামক এক প্রহসনের মধ্য দিয়ে তাদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের সংগঠন ‘কেন্দ্রীয় প্যানেল প্রাইমারি ২০২৫’-এর দাবি, প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী এখনো নিয়োগপত্র পাননি। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা জানানো হয়নি। অন্য একটি হিসাবে নিয়োগবঞ্চিতের সংখ্যা দুই হাজার ২শর বেশি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনে নেতিবাচক তথ্য, ডোপ টেস্টে সমস্যা, স্বাস্থ্য সনদের ঘাটতি এবং শিক্ষা সনদে অসঙ্গতির কারণে অনেক প্রার্থীর নিয়োগ আটকে গেছে। এর মধ্যে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই প্রতিবেদনের কারণেই সবচেয়ে বেশি প্রার্থী বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, নিয়োগপত্র নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত কেউ নিয়োগপত্র না পেলে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে দ্রুত তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। এর আগে নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকও করেন তিনি।
এদিকে ‘কেন্দ্রীয় প্যানেল প্রাইমারি ২০২৫’ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষভাবে পুনঃযাচাই, তথ্যগত ভুলের ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ত্রুটিতে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন করে নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশ।
রবিবার বেলা ১টার দিকে শাহবাগে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক অবরোধ করে প্রায় দুই শতাধিক নিয়োগপ্রত্যাশী বিক্ষোভ করেন। এ সময় রাজীব চন্দ্র নামে একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আমি। বাবা লন্ড্রির কাজ করে অনেক কষ্টে পড়াশোনা করিয়েছেন। অজানা কারণে আমার নিয়োগ আটকে গেল। আমার রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। যদি আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ খুঁজে পায় তাহলে আমাকে জানাতে হবে। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রমাণ দেব। ২৪ এর জুলাই আন্দোলনে রাজপথে মাইর খেয়েছি আজ আমি পুলিশ ভ্যারিফিকেশনে আটকে গেছি এটা লজ্জার।’
রাশেদুল ইসলাম নামে আরেক নিয়োগপ্রত্যাশী বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই আমাকে চেনেন। আমার অপরাধ কি সেটা তো জানাতে হবে? কোনো কারণ না জানিয়ে ভ্যারিফিকেশনের নামে নিয়োগ আটকে দিয়ে আমাকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।