মিষ্টি শুধু একা নন

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম

স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদীয় কার্যক্রম শুরুর দিকেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগে ৪৪ সংসদ সদস্য (গণপরিষদ সদস্য) পদ হারিয়েছিলেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে আনুগত্যের অভিযোগ রয়েছে। আর ২২ জন শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অপরাধে সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছিলেন। মোট ৬৬ জন গণপরিষদ সদস্যের সবাই আওয়ামী লীগের ছিলেন না, কেউ কেউ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেও বাংলাদেশের গণপরিষদে যোগ দেননি। আবার অনেকে গণপরিষদে যোগ দিয়েছিলেন।

তাদের মধ্যে ড. আবু সোলয়মান ম-ল, আজিজুর রহমান, নুরুল হক, হাবিবুর রহমান, সৈয়দ হোসেন মনসুর, আব্দুল গফ্ফার, ডা. আজহার উদ্দিন, একে ফজলুল হক, এবিএম নুরুল ইসলাম, জহির উদ্দিন, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, আব্দুর রহমান ফকির, একেএম মাহুবুবউল ইসলাম, মঈনুদ্দিন মিয়াজি, হাবিবুর রহমান খান, পীরজাদা মো. সাঈদ, মোশারাফ হোসেন শাহজাহান, ইনসান আলী মোক্তার, আব্দুল মতিন ভুইয়া, একে মোশাররাফ হোসেন, এসবি জামান, আফজাল হোসেন, অধ্যাপক শামসুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমেদ সগীর শাহজাদা, অংশু-প্রু-চৌধুরী, কেএম ওবায়দুর রহমান, আকতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, ত্রিদিব রায় (চাকমা রাজা), নুরুল আমিন, ক্যাপ্টেন অব. সুজাত আলী. ডা. কেবিএম আবু হেনা, খন্দকার আবদুুল মালেক ও মীর্জা আবু মনসুর উল্লেখযোগ্য। নুরুল আমিন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন, পরে পাকিস্তানের উপরাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন তিনি।

সংসদ সদস্য কিন্তু গণপরিষদ সদস্য নন এমন কয়েকজনও তাদের সদস্যপদ হারিয়েছিলেন। যেমন মমতাজ বেগম, আবদুল মান্নান, জেনারেল (অব.) ওসমানী ও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। মন্ত্রী মিজানুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মনজুর সদস্যপদ না হারালেও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সংসদ ১৯৭২ সালে সংসদ সদস্যদের বরখাস্ত ও পদত্যাগের এ নজির স্থাপন করেছিল। এরপরের সংসদগুলোতেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে, সদস্যরা পদ হারিয়েছেন। তবে গণপরিষদের মতো একসঙ্গে এতসংখ্যক সংসদ সদস্যের পদত্যাগের দ্বিতীয় ঘটনা বাংলাদেশে নেই।

এরপর বিভিন্ন সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন ও সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন। সংসদ সদস্যপদ হারানো প্রায় সবাই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে সদস্য হয়েছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে শাস্তির মুখোমুখিও হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে মন্ত্রী এনায়েতউল্লাহ খান, উপদেষ্টা আকবর কবির ও একেএম হাফিজ উদ্দিন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

এরপর বিএনপির সাত্তার সরকার থেকে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম ও আকবর হোসেন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। সাত্তারের সময়েই ন্যাপের সংসদ সদস্য সুরুঞ্জিত সেনগুপ্তের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়েছিল। 

দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও সরকারের নীতিবিরোধী বক্তব্যের জন্য ১৯৮০ সালের ২ জানুয়ারি জিয়ার মন্ত্রিসভার উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ব্যারিস্টার মওদুদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ২০০২ সালে বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে ‘দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আদর্শগত’ কারণে অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর প্রতি অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্র্রপতির পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল ডা. বি চৌধুরীকে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি গাজীপুর থেকে নির্বাচতি আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের ছোট ভাই ছিলেন আফসার উদ্দিন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সংসদ থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যপদ হারান ১৯৯৯ সালে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে (২০১৪-২০১৮) প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে পবিত্র হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে মন্তব্য করার কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। পরে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয় এবং তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে দলীয় পদও হারান বর্ষীয়ান এ নেতা।

শেখ হাসিনার টানা তৃতীয় মেয়াধে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ হারান ডা. মুরাদ হাসান। সামাজিক মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী, অশালীন ও চরম আপত্তিকর মন্তব্য এবং একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মুরাদ হাসান। দলীয় পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। এর আগে ভিন্ন কারণে যোগাযোগমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল সৈয়দ আবুল হোসেন ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজকে। তবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায় না থাকায় সংসদ সদস্য পদ হারাননি এ দুই নেতা।

জমি দখল ও লুটপাটের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা এবং সংসদ সদস্য পদ চলে যাওয়ার ঘটনা কমই আছে, যা বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে উঠেছে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, দুর্নীতি-লুটপাট ও নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত থেকে দলীয় পদ, সংসদ সদস্যপদ এমনকি মন্ত্রিসভা থেকে বিএনপি-আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের পদত্যাগের ঘটনা নতুন নয়। অতি সম্প্রতি জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে দলীয় পদ হারিয়েছেন। অতীতেও এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে। শাস্তিও পেতে হয়েছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার (মা ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্র) গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাটের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অভিযোগের তীর ওঠে মিষ্টির দিকে। তাতেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মিষ্টি।

ঘটনার এক সপ্তাহ পার না হতেই বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ তথ্য জানিয়েছেন। একই দিন জাতীয় সংসদে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত