চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনে চলছে পাহাড় কাটা, যা বলছে কর্তৃপক্ষ

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং ইউনিয়নের হারবাং বনবিট কার্যালয়ের পাশ থেকে পূর্ব দিকে চলে গেছে সরু একটি পথ। কোথাও ইট বিছানো, কোথাও কাঁচা। দুই পাশে গর্জনগাছ, কোথাও ধানখেত, আবার কোথাও পথের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পথ ধরে যতই ভেতরে যাওয়া যায়, ততই দেখা মেলে পাহাড়-টিলা কাটার চিহ্নের।

সরেজমিনে দেখা যায়, পথটির শুরুতেই উত্তর পাশের একটি টিলা কেটে সড়কের সঙ্গে সমান করা হয়েছে। প্রায় আধা কিলোমিটার এগিয়ে উত্তর করমুহুরীপাড়ায় দেখা যায় আরেকটি পাহাড় কাটার চিহ্ন। সাবানঘাটা সেতু পার হওয়ার পর প্রায় ৬০০ ফুট এলাকায় পাহাড় কেটে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। কোথাও ৫ ফুট, কোথাও ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে। কাটা অংশের প্রস্থ ১০ থেকে ১২ ফুট। কয়েকটি গাছ কাটার চিহ্নও দেখা গেছে।

এই পথ কক্সবাজারের চকরিয়ার প্রায় শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত ৬ থেকে ৮ ফুট চওড়া সরু পথটিই এখন প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা সড়কে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সড়কটির প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশ গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের মধ্যে পড়েছে। এ বনে বন্য হাতির চলাচল রয়েছে। সড়কের পাশে রয়েছে গর্জনগাছ এবং প্রায় ৫০ একর সুফল বনায়ন। বন বিভাগের দাবি, প্রকল্প নেওয়ার আগে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের বিষয়ে তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি।

পাহাড় কাটার বিষয়টি বন বিভাগের নজরে আসে গত ১৭ সেপ্টেম্বর। এর পাঁচ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতরে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে বলেন চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবির হাসান। তবে চিঠি দেওয়ার পরও কাজ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে পাহাড় কাটার চিহ্ন ও নির্মাণকাজের আলামত পাওয়ায় বন বিভাগের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের অনুমতি না থাকলে সেখানে প্রায় ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলো কীভাবে? প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় সংরক্ষিত বনভূমির বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। ২০২০ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। তাহলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় বনভূমির অবস্থান ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি কেন উঠে আসেনি, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

হারবাংয়ের সড়কটি এলজিইডির দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল ২০২০ সালে। সংরক্ষিত বনের মধ্যে সড়ক চলে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ভুল হতে পারে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হবে না। সংরক্ষিত বনের মধ্যে কাজ করা তাদের দায়িত্বও নয়।

বন বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, সংরক্ষিত বনের মধ্যে কাজ করা তাদের ম্যান্ডেট নয়। তবে সরেজমিনে পাহাড় কাটার চিহ্ন এবং নির্মাণকাজের আলামত বলছে, বন বিভাগের আপত্তি ও কাজ বন্ধের নির্দেশের পরও বিষয়টি পুরোপুরি থামেনি। ফলে প্রকল্পের অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বন বিভাগের নির্দেশ বাস্তবায়ন, তিনটি বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো সরু পথটি পাকা ও প্রশস্ত হলে বনের ভেতরে মানুষের পাশাপাশি যানবাহনের প্রবেশ সহজ হবে। এতে গাছ চুরি, বন্য প্রাণী শিকার ও নতুন করে বনভূমি দখলের সুযোগ বাড়তে পারে। যানবাহন চলাচল বাড়লে বন্য হাতির স্বাভাবিক চলাচলেও বাধা তৈরি হতে পারে। আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হলে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের প্রবেশ বাড়ে। এতে জবরদখল, গাছ কাটা ও বন্য প্রাণী শিকারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেবে বন বিভাগ।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত