বঙ্গোপসাগর থেকে একের পর এক ছোট-বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। স্রোতের টানে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে সৈকতের বালু। এতে কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা গেয়া গাছটির শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। সেই শিকড়ের ফাঁকে আটকে আছে অসংখ্য প্লাস্টিক ও জেলেদের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া জাল। কাণ্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত জাল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্লাস্টিক-জালের ফাঁসে যেন শ্বাসরোধ হয়ে আসছে কুয়াকাটার উপকূলীয় বনাঞ্চলের।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার লেম্বুরবন সৈকতে সমুদ্রভাঙনের পাশাপাশি প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালের দূষণ বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। শিকড় ও কাণ্ডে জড়িয়ে থাকা এসব বর্জ্য একদিকে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় প্রাণীর জন্যও তৈরি করছে ঝুঁকি।
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা স্থানীয় জেলে সোহেল মাঝি বলেন, সাগর থেকে ফেরার পর ছেঁড়া বা নষ্ট জাল অনেক সময় নৌকার আশপাশে ফেলে রাখা হয়। কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ঝোপঝাড়ে ফেলেন। আবার কিছু জাল বাড়ির সীমানায় বেড়া দেওয়ার কাজেও ব্যবহার করা হয়। অনেকে সাগরপাড়ে এসব জাল পুড়িয়ে ফেলেন।
তিনি বলেন, মাছ ধরার সময় কোনো জাল ছিঁড়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে অনেক সময় সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সেসব জাল সমুদ্রে ভেসে যায়। আবার সৈকতে জাল মেরামতের সময় কাটা বা ছেঁড়া অংশও অনেক সময় আশপাশে পড়ে থাকে। এসব জাল পরিবেশের ক্ষতি করে তা অনেক জেলেই জানেন, তবে সবাই হয়তো সচেতন নন। জেলেদের জন্য জাল ও জালের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা হলে তারা সেখানে ফেলবেন।
লেম্বুরবনের ফিস ফ্রাই দোকান ব্যবসায়ী ফারুক বলেন, সৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের বর্জ্যও পড়ে থাকে। মাছ ধরার ছেঁড়া জালও অনেক সময় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এগুলো দেখতে যেমন খারাপ লাগে, তেমনি গাছপালা ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। নির্দিষ্ট জায়গায় জাল ও বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকলে সবাইকে সেখানে ফেলতে উৎসাহিত করা যেত।
পরিবেশকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, সৈকতে বিক্ষিপ্তভাবে মাছ ধরার জালের ছেঁড়া অংশ ফেলার কারণে একদিকে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্লাস্টিক ও নাইলনের তৈরি পরিত্যক্ত জাল দীর্ঘদিন প্রকৃতিতে থেকে যায়। এসব জাল পর্যটকদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, কুয়াকাটার সৈকত ও লেম্বুরবনকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্লু অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডব্লিউসিএস (WCS) ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, পরিত্যক্ত বা হারিয়ে যাওয়া মাছ ধরার জালকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘অ্যাব্যান্ডন্ড, লস্ট অর ডিসকার্ডেড ফিশিং গিয়ার’ (এএলডিএফজি) বা ‘ঘোস্ট গিয়ার’ বলা হয়। এসব জালে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, কচ্ছপ, ডলফিন, তিমিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী আটকে মারা যেতে পারে।
তিনি বলেন, সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকা জাল প্রবাল, সি-গ্রাসসহ বিভিন্ন জলজ আবাসস্থলের ক্ষতি করতে পারে। নাইলনসহ কৃত্রিম উপাদানে তৈরি এসব জাল সহজে পচে না। সময়ের সঙ্গে ভেঙে প্লাস্টিক দূষণ বাড়াতে পারে। হারিয়ে যাওয়া একটি জাল দীর্ঘ সময় পানিতে থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরতে থাকলে তাকে ‘ঘোস্ট ফিশিং’ বলা হয়। এতে মাছের মজুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়।
বখতিয়ার রহমানের মতে, শুধু জাল পানিতে না ফেলার সচেতনতা তৈরি করলেই হবে না। জাল কেনা থেকে ব্যবহার, হারিয়ে গেলে রিপোর্ট করা, উদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জালে মালিক বা নৌকার পরিচয় নম্বর যুক্ত করা, পুরোনো ও ছেঁড়া জাল ফেরত দিলে প্রণোদনা দেওয়া এবং কুয়াকাটা, আলীপুর ও মহিপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাছ অবতরণকেন্দ্রে জাল সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, স্বেচ্ছাসেবী দলগুলোর মাধ্যমে উপকূল ও সৈকতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত জাল নিয়মিত সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে জমা দেওয়া এবং পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি নিয়মিত ‘ঘোস্ট গিয়ার’ উদ্ধার অভিযান, জেলেদের প্রশিক্ষণ এবং একটি ‘ঘোস্ট গিয়ার বেসলাইন স্টাডি’ পরিচালনার মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।
বন বিভাগের লেম্বুরবন বিট কর্মকর্তা আমির হামজা বলেন, গাছটি উপকূলীয় পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গাছের শিকড় মাটি ও বালু ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের কারণে বালু সরে গিয়ে গাছটির শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় এটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল শিকড় ও কাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে গাছটির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জালটি দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে সরিয়ে ফেলা গেলে গাছটির শিকড় ও কাণ্ডকে আরও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। পাশাপাশি সমুদ্রসৈকতে পরিত্যক্ত জাল না ফেলার বিষয়ে জেলে ও সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের পরিদর্শক মো. নাজমুল হাসান বলেন, সাগরে মাছ ধরার সময় অনেক ক্ষেত্রে জেলেরা জাল টেনে তুলতে না পারলে সেটি কেটে দেন। আবার জালে প্যাঁচ লাগলেও অনেক সময় জাল কেটে সাগরে ফেলে দেন। এসব পরিত্যক্ত জাল ভাসতে ভাসতে একপর্যায়ে সৈকতে চলে আসে। এতে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি সৈকতের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে এসব জাল ফেলে দেওয়ার কারণে কারা বা কোন জেলেরা এ কাজ করছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় মহিপুর ও আলীপুর মাছবাজারের গদি মালিকদের জানানো হবে। পাশাপাশি সৈকত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে পৌরসভাকেও অবহিত করা হবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা লেম্বুরবন, তিন নদীর মোহনা, কাউয়ারচর ও গঙ্গামতির চর এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে সমুদ্রে পরিত্যক্ত জাল না ফেলার বিষয়ে সচেতন করবেন। এরপরও কেউ এ ধরনের কাজ করলে এবং তা শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, সৈকতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এসব জাল অপসারণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে সৈকতে এ ধরনের জাল ও বর্জ্য না ফেলা হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হবে।
কুয়াকাটার লেম্বুরবনের উন্মুক্ত শিকড় আর জালে জড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে তাদের সংকটের কথা। সমুদ্রভাঙনের সঙ্গে প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত জালের চাপ অব্যাহত থাকলে উপকূলের এই বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।