মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করা সন্তানের জন্য আবশ্যিক দায়িত্ব। মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্কে ভালোবাসা আছে, মায়া আছে, দায়িত্ব আছে। তবে কখনো কখনো সামান্য কথাও ঝগড়ায় রূপ নেয়। রাগের মুহূর্তে বলা একটি কঠিন কথা মা-বাবার মনে গভীর কষ্ট তৈরি করতে পারে। তাই মতের অমিল হলেও সন্তানের উচিত কথায় সংযম রাখা। কণ্ঠে কোমলতা রাখা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের সঙ্গে উফ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল/২৩)
এই আয়াতে মা-বাবার সঙ্গে আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। শুধু তাদের কষ্ট দেওয়া বা অপমান করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়নি। এমনকি বিরক্তি প্রকাশের সামান্য শব্দও ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে সন্তানের ভাষা, কণ্ঠস্বর ও আচরণে বিশেষ সতর্কতা থাকা প্রয়োজন।
মানুষের জীবনে মতের অমিল থাকবেই। মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য হতে পারে। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বন্ধুত্ব, পোশাক, চলাফেরা কিংবা জীবনযাপনের নানা বিষয়ে দুই প্রজন্মের চিন্তায় পার্থক্য দেখা দিতে পারে। সন্তানের কাছে যে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়, মা-বাবার কাছে সেটি হয়তো উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আবার মা-বাবার কোনো সিদ্ধান্ত সন্তানের কাছে কঠিন বা অযৌক্তিক মনে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নিজের কথা বলার অধিকার সন্তানের আছে। কিন্তু সেই কথা বলার ধরন গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মতপ্রকাশ করতে গিয়ে কণ্ঠস্বর উঁচু করা, তর্কে জড়িয়ে পড়া, ব্যঙ্গ করা কিংবা অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। একটি বিষয় সঠিক হলেও তা ভুল পদ্ধতিতে বললে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘আর তাদের উভয়ের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের বাহু অবনত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল/২৪)
শৈশবে সন্তান যখন অসহায় ছিল, তখন মা-বাবা তাকে আগলে রেখেছেন। তার কান্নায় জেগেছেন। অসুস্থতায় পাশে থেকেছেন। নিজের স্বস্তি বিসর্জন দিয়ে সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করেছেন। সন্তান বড় হওয়ার পর তাদের সঙ্গে আচরণে সেই মমতা ও কৃতজ্ঞতার প্রতিফলন থাকা উচিত।
তাই মা-বাবার কোনো কথায় কষ্ট পেলে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দেওয়া ঠিক নয়। আগে নিজেকে শান্ত করা দরকার। রাগের সময় মানুষ এমন অনেক কথা বলে ফেলে, যা পরে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। একটি কঠিন বাক্য মুখ থেকে বের হয়ে গেলে ক্ষমা চাওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই বাক্যের আঘাত অনেক সময় মা-বাবার মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়।
কখনো মা-বাবাও ভুল করতে পারেন। তারাও মানুষ। বয়স, অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি ও চিন্তার পার্থক্যের কারণে তাদের কোনো সিদ্ধান্ত সন্তানের কাছে ভুল মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি। অসম্মান না করে, শান্তভাবে নিজের কথা বোঝানো যায়। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করা যায়। রাগের মুহূর্তে বোঝানোর চেষ্টা না করে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর কথা বলা বেশি ফলপ্রসূ।
মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়া এড়ানোর আরেকটি উপায় হলো, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা। অনেক সময় সন্তান মনে করে, মা-বাবা তার কথা বুঝতে চান না। আবার মা-বাবারও মনে হতে পারে, সন্তান তাদের কথা শুনতে চায় না। এই দূরত্ব থেকেই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। সন্তান যদি ধৈর্য ধরে মা-বাবার কথা শোনে, তাদের উদ্বেগের কারণ বোঝার চেষ্টা করে, তাহলে অনেক বিরোধ সহজেই কমে যেতে পারে।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক