সুন্দর জীবন পেতে মনের যত্ন

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

শরীর সুস্থ থাকলেই মানুষ পুরোপুরি সুস্থ থাকে না। মনের সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখ, ভয়, হতাশা, অপূর্ণতা ও নানা মানসিক চাপ ধীরে ধীরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। ইসলাম মানুষের মনের প্রশান্তি, সংযম, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার শিক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

শরীর ও মন একটি অপরটির পরিপূরক। তবে মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি শরীর মনকে, সেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অবকাঠামো ও ক্রিয়াকলাপের বাহ্যিক রূপ বিদ্যমান। কিন্তু মনের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। আমরা মন বলতে বুঝি, চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, কল্পনা ও ইচ্ছা প্রভৃতির মতো মানসিক কাজের সমষ্টিকে।

মনের বিষয়টি শরীরের মতো নয়। মানসিক কাজ যখন চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা ইত্যাদি দ্বারা হয়, তখন মনেরও পরিশ্রম হয়। তবে কেউ কোনো কিছুর বিয়োগ, ভয় কিংবা হতাশায় গভীরভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে, কারও কোনো ইচ্ছাপূরণ না হলে, কারও কথা ও কাজে প্রচণ্ড দুঃখ পেলে মন আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই আঘাতের প্রভাব যখন মনে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মানুষ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়। এই মানসিক অবসাদ শরীরকে বিষিয়ে তোলে। মন প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, মানুষের শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, যখন তা ঠিক থাকে, তখন সমস্ত শরীর ঠিক থাকে। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর খারাপ হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি ৫২)

শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও জরুরি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রতিষেধক দ্রব্য গ্রহণ করা হলেও মনের অবকাঠামোগত কোনো বাহ্যিক আকৃতি না থাকায় মানসিক অসুখের সুস্থতার ক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যায় না।

মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূলে রয়েছে, রোগগ্রস্ত ব্যক্তির নেতিবাচক চিন্তা করা কিংবা অপর কারও থেকে মানসিক আঘাত পাওয়া। মানবতার ধর্ম ইসলাম মানসিক রোগের মূলকে উৎপাটন করে। যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনা করা ক্ষতিকর কিংবা যে বিষয়ের চিন্তা-ভাবনায় হতাশা ও বিষণœতা বাড়ে, ইসলাম সে বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে নিষেধ করে।

এমন কোনো বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করা, যার কারণে মানসিক অবসাদ আসতে পারে সেটার জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পড়াশোনায় অকৃতকার্য, কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা, উপার্জনে অক্ষমতা, দাম্পত্য জীবনে অসুখী, নিঃসন্তান থাকা এবং কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জন করতে না পারা প্রভৃতি বিষয়ে ব্যর্থ হয়ে মানুষ ভয়ংকর রকমের বিষণœতায় ভোগে। অথচ কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘বিষণœ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তওবা/৪০)

মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম। তা শারীরিক হোক কিংবা মানসিক। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব/৫৮)

ইসলাম অল্পে তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। কাক্সিক্ষত বস্তু অর্জিত না হলেও অল্পে তুষ্টির শিক্ষা মানুষকে বিষণœতা থেকে মুক্ত রাখে। সর্বোপরি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ইসলামি অনুশাসন মেনে চললে এবং পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আশা করা যায়, কারও পরিবারের কোনো সদস্য মানসিক অবসাদে ভুগবে না। তবুও আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনায় কেউ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হলে পরিবারের সদস্যদের উচিত তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া।

মানসিক রোগী পাগল নয়। দুঃখ-কষ্ট ও হতাশায় ভুগে যে কারও এমন অবস্থা হতে পারে। অনেক সময় এমন রোগগ্রস্ত মানুষের প্রতি অসহ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নানা অপ্রীতিকর ও জঘন্য খারাপ আচরণ করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরিবার-পরিজনদের সহমর্মিতা ও যত্নশীলতায় ধীরে ধীরে সেরে উঠতে পারে। এর অন্যথায়, হতাশায় ভুগে ভুগে স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে মানুষটি। শরীরের চেয়ে মনের সুস্থতার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অথচ যারা মানসিক সমস্যায় ভোগে তাদের বেশির ভাগকেই চিকিৎসা নিতে দেখা যায় না।

আরেক শ্রেণির মানসিক রোগগ্রস্ত মানুষ আছে, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিষফোঁড়া। যাদের মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ দুশ্চিন্তা নয় বরং লোভ ও ভোগবাদিতা। ভোগবাদিতার কারণে তাদের মানবিকবোধ লোপ পেয়েছে। লোভ ও ভোগের নেশায় তারা যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে পিছপা হয় না। ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে সমাজের অসহায় দুর্বলদের ওপর নির্যাতন করে, তাদের রক্ত চুষে নিজেদের ভোগবাদের সাম্রাজ্য কায়েম করে।

তারা এসব করে মূলত মানসিক স্বাস্থ্যহীনতার কারণে। ধর্মীয় ভীতি এবং সুশিক্ষার অভাবে তাদের মানস থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমাজে যেখানে সাম্য-শান্তির চর্চা হয়, সেখানে এমন ভোগবাদী মানসিকতা পোষণ করলে সেটা মানসিক অসুস্থতা হিসেবেই সংজ্ঞায়িত হবে।

লেখক : ইসলামি গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত