১৩০ স্বর্ণপদক গায়েব!

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৩ এএম

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও ডিগ্রি পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০২৪ সালে; তাদের জন্য স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেওয়ার কথাও ছিল।

সারা দেশে কোটা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে ২১ জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের এসএমএস দিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিত করার কথা জানায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এরপর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ১৩০ জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি।

চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নগদ ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টের কী হয়েছে, পুরস্কারের তালিকা কেন পরিবর্তন করা হলো এবং এর পেছনে কী প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত ছিল, সেসব বিষয়ে তদন্তের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন পুরস্কার থেকে বাদপড়া শিক্ষার্থীরা। গত ২২ সেপ্টেম্বর দুদক চেয়ারম্যানের কাছে এ আবেদন করা হয়। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।

দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই জারিকৃত অফিস আদেশে ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের অনার্স এবং ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের ডিগ্রি (পাস) পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। একই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২৪ জুলাই ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সম্মেলনকক্ষে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিতের কথা জানানো হয়। এসএমএসে বলা হয়, অনিবার্য কারণে ২৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে এবং পরিবর্তিত তারিখ পরে জানানো হবে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও পরিবর্তিত তারিখ আর জানানো হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের জন্য ১৩০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার পর তাদের বাদ দিয়ে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। তবে আগের তালিকা বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে ১৩০ শিক্ষার্থীকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। নতুন ৫৮ শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া, কেন ও কার সুপারিশে পুরনো তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে এবং কী কারণে ২০২৪ সালে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

কোথায় গেল ১৩০ স্বর্ণপদক : পুরস্কারবঞ্চিত শিক্ষার্থী রোকসানা আক্তার বলেন, ‘২০২৪ সালের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ১৩০টি স্বর্ণপদক ও ক্রেস্ট প্রস্তুত হওয়ার কথা। স্বর্ণপদক তৈরির জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। সেসব স্বর্ণপদক এখন কোথায়? চলতি বছর যাদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তাদের স্বর্ণপদক দেওয়া হয়নি, ২৫ হাজার টাকা ও সনদপত্র দেওয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীদের পুরস্কার দেওয়া হলো কি না, সেটি দেখলেই শেষ হয় না। তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মেধাভিত্তিক নির্বাচন, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়টি জানা দরকার। ২০২৪ সালের জন্য ১৩০টি স্বর্ণপদক ক্রয় বা প্রস্তুত করা হয়ে থাকলে সেগুলোর ক্রয়াদেশ, বিল-ভাউচার, অর্থ পরিশোধ, সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থান সব জানা দরকার।’

আরেক শিক্ষার্থী অন্তরা খানম বলেন, ‘২০২৪ সালের সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুযায়ী, ১৩০ শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালে তালিকা পরিবর্তন করা হলে এর প্রশাসনিক ভিত্তি ও আর্থিক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘বাদপড়া শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দুদকে দেওয়া আবেদনে ২০২৪ সালের ১৩০ জনের মূল তালিকা ও ২০২৬ সালের ৫৮ জনের তালিকা যাচাই, তালিকা পরিবর্তনের প্রশাসনিক ভিত্তি এবং স্বর্ণপদক সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের বিষয়টির তদন্ত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।’ অন্তরা বলেন, ‘১৫ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের তালিকায় থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও পুরস্কার পেয়েছে। আগের তালিকার কতজনকে নতুন করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার হিসাব আমরা পাইনি।’

কোন প্রক্রিয়ায় অ্যাওয়ার্ডের তালিকা বদলানো হয় : শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২৬ সালে নতুন করে ৫৮ শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করা হলে তা কোন নীতিমালায় করা হয়েছে? তার অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সুপারিশ ও ভাইস চ্যান্সেলরের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি থাকার কথা। আর যদি ২০২৪ সালের তালিকা পুনর্বিবেচনা করে পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়েছে, কোন কমিটি তা করেছে, কী কারণে আগের তালিকা বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে সব তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ভিসি, প্রোভিসির সঙ্গে দেখা না হওয়ার অভিযোগ : পুরস্কার থেকে বাদপড়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও তাদের সাক্ষাৎ দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে অফিস থেকে সনদপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন; তবে তাদের জন্য নতুন কোনো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে না।

শিক্ষার্থীরা বলেছেন, একবার কাউকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করার প্রায় দুই বছর পর সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো এবং সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন কখনো অনুষ্ঠানে স্থান সংকুলানের সমস্যা, কখনো প্রশাসনিক সমস্যা প্রভৃতি। এসব যদি সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে পুরস্কারের জন্য আগে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলো কেন?

অ্যাওয়ার্ড নীতিমালায় কী আছে : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একাডেমিক কাউন্সিলের ১৯তম সভার সুপারিশের ভিত্তিতে একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেটের ২৫৫তম সভায় সংশোধিত অ্যাওয়ার্ড নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। নীতিমালার দ্বিতীয় ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃক প্রকাশিত স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতক (পাস) কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনকারী শিক্ষার্থীকে অ্যাওয়ার্ডের জন্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চম ধারায় বলা হয়েছে, অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনকারী একজন শিক্ষার্থীকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হবে। একই নম্বর বা ফল হলে এইচএসসি পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার অষ্টম ধারায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সনদ ও স্বর্ণপদক দেওয়ার কথার উল্লেখ রয়েছে। ফলে ২০২৪ সালের অফিস আদেশে নির্বাচিত ১৩০ শিক্ষার্থীর তালিকা পরে কীভাবে পরিবর্তিত হলো, তার প্রশাসনিক ভিত্তি কী এবং ১৩০ শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করা স্বর্ণপদক ও অন্যান্য সামগ্রীর কী হয়েছে সেসবের তদন্ত দরকার।

দুদক বলছে, অভিযোগ যাচাই করা হবে : বাদপড়া শিক্ষার্থীদের দাবি তদন্ত হলে ২০২৪ সালের ১৩০ শিক্ষার্থীর তালিকা, ২০২৬ সালের ৫৮ শিক্ষার্থীর তালিকা, দুই তালিকার মধ্যে পরিবর্তনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যবিবরণী, অনুমোদনের নথি এবং স্বর্ণপদক-ক্রয় ও বিতরণসংক্রান্ত আর্থিক নথির যাচাই করা হোক। সেই সঙ্গে স্বর্ণপদক ও ক্রেস্টগুলোর বর্তমান অবস্থাও জানানো হোক।

এ বিষয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩০ শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড প্রদানবিষয়ক একটি অভিযোগ দুদকে জমা হয়েছে। অভিযোগটি যাচাই করে সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে গতকাল রবিবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ ফেরদৌসের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত