পাবনায় ভেজাল দুধ তৈরির দুই কারখানায় অভিযান, লাখ টাকা জরিমানা

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ পিএম

পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় দুধের নামে তৈরি হচ্ছিল জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভেজাল খাদ্যপণ্য। কোথাও দুধে মেশানো হচ্ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, আবার কোথাও জেলি ও ভোজ্যতেল ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছিল নকল দুধ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছদ্মবেশে পরিচালিত অভিযানে এমন ভয়াবহ অনিয়মের সন্ধান পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ ঘটনায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা, একটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে সিলগালা এবং একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনা জেলা কার্যালয় ও ফরিদপুর উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত অভিযানে এসব অনিয়ম উদ্ঘাটিত হয়।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর উপজেলায় ভেজাল ও নকল দুধ উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের বিষয়ে গোপন তথ্য পাওয়ার পর কৌশলগতভাবে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অপরাধীদের হাতেনাতে শনাক্ত করতে বিকেল ৩টা থেকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসহায়তা ও স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রমের আড়ালে নজরদারি শুরু করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সন্ধ্যার পর ভেজাল দুধ তৈরির কার্যক্রম শুরু হলে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।

অভিযানের প্রথম পর্যায়ে উপজেলার পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়া এলাকায় শামীম হোসেনের প্রতিষ্ঠানে দুধে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেশানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১০০ গ্রাম হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড উদ্ধার করা হয়। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে দুধে ভেজাল দেওয়ার অপরাধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪২ ধারায় প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অন্যদিকে, স্বপ্ন ডেইরি ফার্মে অভিযান চালিয়ে জেলি ও ভোজ্যতেল ব্যবহার করে নকল দুধ উৎপাদনের চিত্র দেখতে পান কর্মকর্তারা। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ছদ্মবেশে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসহায়তা ও স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগে কারখানায় প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে জেলি, সয়াবিন তেল ও দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ব্লেন্ড মেশিন পাওয়া যায়।

বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি ঘটনাস্থলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নকল দুধ উৎপাদনের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট একজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে সিলগালা করে। অভিযানে জব্দ করা দুই ড্রাম জেলি ও এক ড্রাম পামওয়েল ধ্বংস করা হয়।

অভিযান চলাকালে পুলিশের একটি দল ও র‍্যাব-১২-এর সদস্যরা উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করেন।

শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুধে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও জেলিজাতীয় পদার্থের মতো অননুমোদিত উপাদান মেশানো জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

এসব পদার্থের প্রকৃতি, পরিমাণ ও গ্রহণের মাত্রার ওপর নির্ভর করে বমি, ডায়রিয়া, পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রদাহসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশুদের স্বাভাবিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর ঘটনা বিশেষ উদ্বেগজনক। কারণ শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের খাদ্যতালিকায় দুধের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। ফলে এ ধরনের অনিয়ম শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণাই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।

ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুধসহ যেকোনো খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো, নকল পণ্য উৎপাদন কিংবা নিম্নমানের খাদ্য বাজারজাতকরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে দুধ কেনার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে অধিদপ্তর। বিশ্বস্ত ও অনুমোদিত উৎস থেকে দুধ সংগ্রহ, রং, গন্ধ কিংবা ঘনত্বে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা ব্যবহার না করা এবং সন্দেহজনক খাদ্যপণ্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু দুধ ফুটিয়ে কিংবা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে সব ধরনের রাসায়নিক ভেজাল শনাক্ত বা দূর করা সম্ভব নয়।

ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বা বাজারজাতকরণের তথ্য পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিকটস্থ কার্যালয় অথবা জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য ও স্বার্থ সুরক্ষায় ভেজাল, নকল ও অনিরাপদ খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী নিয়মিত তদারকি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত