কোন পথে এগোচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্র?
সত্যি কথা বলতে, এখন তো চলচ্চিত্রে কোনো বিভাজন নেই। মূলধারা, বিকল্পধারা কিংবা মনস্তাত্ত্বিক সব ধরনের সিনেমাই নির্মাণ হচ্ছে। পরিসর ছোট অথবা সংখ্যায় কম হলেও এসব সিনেমা এখন দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে, দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে। তরুণ মেধাবী পরিচালকরা এগিয়ে আসছে। আমি দুয়েকটি সিনেমা দেখেছি, তারা মেধার পরিচয় দিয়েছে, কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করছে। এই চর্চা যদি আগামী প্রজন্মের মধ্যে আসে এবং সেটাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে ভালো স্ক্রিনপ্লে তৈরি করে তাহলে অবশ্যই সেটা ভালো। তবুও বলব মূলধারার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। আর একজনকে দিয়ে মূলধারাকে টিকিয়ে রাখা অকল্পনীয়।
এর জন্য কী কী পদক্ষেপ জরুরি এখন?
চলচ্চিত্রশিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সবার আগে জরুরি আমাদের সমিতিগুলো বিশেষ করে চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতিকে সক্রিয় হতে হবে। আর শিল্পী-কলাকুশলীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। ওই যে বললাম, একজনকে দিয়ে মূলধারাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। এর জন্য আরও নায়ক-নায়িকা দরকার। প্রয়োজনে নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রম আবার চালু করতে হবে। আমাদের প্রযোজক সমিতি, পরিচালক সমিতি, শিল্পী সমিতিসহ বেশ কিছু সংগঠন আছে। কিন্তু নতুন যে প্রজন্ম আসছে, তারা কী করছে? পিকনিক করছে, ফুটবল খেলছে। অথচ শিল্পী নেই, ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার নেই, ভালো মিউজিক ডিরেক্টররা চলে গেছেন।
নতুন শিল্পী তৈরির বিষয়ে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন?
গুরুত্ব আছে বলেই গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি বারবার সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বকে বলেছি, নতুন মুখের কর্মসূচি করুন। লাল-সবুজের মাধ্যমে নতুন শিল্পী খুঁজে বের করা যায়। আমরা চেষ্টা করলে নতুন শিল্পী তৈরি করতে পারব। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কারণ আমরা নতুন মুখের কর্মসূচি থেকে মান্না, আমিন খান, অমিত হাসান, দিতিসহ অসংখ্য শিল্পী পেয়েছি। তাহলে এখন নতুন মুখের কর্মসূচি করা হবে না কেন? এটি আমার কাছে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র মনে হয়। আমি বর্তমান ক্যাবিনেটের সচিবকে বারবার বলেছি নতুন মুখের কর্মসূচি করুন। এতে অনেক ছবি তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে, সংগঠনও ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু পরিচালকরা বসে বসে চা খেয়ে পত্রিকা পড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।
এখনকার শিল্পীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায় দেখছেন?
এখন অনেকে আসে, কিন্তু তাদের গ্রুমিং হয় না। অভিনয় শেখানো হয় না, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কী হবে, ডায়ালগ থ্রোয়িং কী হবে, মডুলেশন কীভাবে হবে, স্টেপিং কী হবে কিছুই শেখানো হয় না। ফলে শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। আমরা যখন কাজ শুরু করেছি, শিল্পীকে চরিত্র অনুযায়ী তৈরি করা হতো। একজন শিল্পীকে গল্প, চরিত্র, পোশাক, মেকআপ, গেটআপ, পারিবারিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতে হতো। এখন অনেকেই মোবাইলে কথা বলছে, মেকআপ করছে, সেটে কী সিকোয়েন্স চলছে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। ‘রেডি, রেডি, চলেন টেক’ এভাবে তো ক্রিয়েটিভ কাজ হয় না। সিনেমা কোনো কামলার কাজ নয়, এটি সৃজনশীল কাজ।
আগের শিল্পী ও এখনকার শিল্পীদের ব্যবধান কতটুকু?
আমি ১৯৮৬ সালে কাজ শুরু করি। তখন জসিম, জাফর ইকবাল, আজিম সাহেব, আহমেদ শরীফ, রাজীব, রোজিনা, অঞ্জনার মতো শিল্পীরা জনপ্রিয় ছিলেন। তারা পরিচালক যা বোঝাতেন, দ্রুত সেটা ধারণ করতে পারতেন। কারণ তাদের ডিভোশন ও ডেডিকেশন ছিল। তখন শিল্পী একটি ছবি করার পর পরের ছবির জন্য পরিচালককে ফোন দিতেন। চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে পোশাক নিয়ে এসে সেটাই পরে অভিনয় করা হচ্ছে। একটি চরিত্রের পরিচয় কী, কোথা থেকে এসেছে, তার পারিবারিক অবস্থান কী, শিক্ষাগত যোগ্যতা কী এসব জানতে হবে। চরিত্রের ম্যানারিজম, পারিপার্শ্বিকতা, পোশাক, বাড়ি, অফিস, কর্মজীবন নিয়েও আলোচনা করতে হবে।
শাকিব খানকে নিয়ে এখন একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শাকিব খানকে ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করেছে। আমি চাই শাকিব খানও ইন্ডাস্ট্রির জন্য কিছু করুক। মান্না যেমন শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেন, ইন্ডাস্ট্রির ভালো ছবি কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবতেন, শাকিব খানও সেই মানসিকতায় ভাবতে পারতেন। আজ যারা ছবি বানানোর চিন্তা করছেন, তাদের ফোন করে বাসায় গিয়ে বসা উচিত। বলা উচিত ‘স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন, আমি ছবি করব। এটাই শিল্পের প্রতি প্রেম। যে শিল্প তাকে এত বড় তারকা বানিয়েছে, তার জন্য কিছু করা দরকার। তার নামে বাংলাদেশে সিনেমা হল বুক হয়ে যায়। তিনি অনেক পেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কী দিয়েছেন, কী দিচ্ছেন? তবে তার জন্য শুভকামনা থাকবে। মানুষ পরিবর্তনও হতে পারে। এখনো তার বয়স ও অবস্থান এমন যে চাইলে তিনি দায়িত্বশীল হতে পারেন এবং ইন্ডাস্ট্রিকে পরিবর্তনের দিকে নিতে পারেন।
আপনার সিনেমার মাধ্যমে শাকিব ও অপু জনপ্রিয় জুটি হিসেবে পরিচিতি পান। তাদের কীভাবে তারকা হিসেবে গড়লেন?
শাকিবকে আমি আজিজের (নৃত্যশিল্পী) বাসা থেকে নিয়ে এসেছিলাম। তখন সে সেখানে থাকত। আড়াই-তিন মাস গ্রুমিং করেছিলাম। এরপর ছবি বানাই। ‘অনন্ত ভালোবাসা’ দিয়ে শাবনূরের সঙ্গে কাজ করল। এরপর ‘এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে’, ‘ফুল নেব না অশ্রু নেব’, ‘স্বপ্নের বাসর’—এভাবে একের পর এক ছবি করেছে। তখন শাবনূর ও পূর্ণিমা ব্যস্ত ছিলেন। ‘কাল সকালে’ ছবিতে একটি মেয়ে ছিল, যাকে আমজাদ হোসেন নিয়ে এসেছিলেন। আমার মনে হলো মেয়েটিকে নায়িকা করা যায়। পরে তাকে এনে টেকনিশিয়ানদের বললাম, সমস্যা কী? তারা বলল, আপনিই বলেন। আমি বললাম, চুল ও কপালে কিছু সমস্যা আছে, দাঁতেও সামান্য সমস্যা আছে। ক্লোজআপগুলো একটু কার্ভ অ্যাঙ্গেলে নিলে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। েদুই দিন পরই সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল। অনেক বড় শিল্পীর মধ্যে একমাত্র নায়িকা হিসেবে কাজ করল। ছবি সুপারহিট হলো। এরপর পরপর পাঁচটি ছবি সুপারহিট হয়। শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস সুন্দর একটি জুটি হয়ে যায়।