একই উঠানে আতরের সুবাস ও ধূপের গন্ধ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৭ এএম

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৩টা ৫০ মিনিট। শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দে মুখরিত লালমনিরহাট পৌর শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী মন্দির প্রাঙ্গণ। কাঁসরের খমক আর ঢাকের তালে তালে তখন পূজাম-প জমে উঠেছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ধূপকাঠি আর কর্পূরের পরিচিত সুবাস। হঠাৎই ঘড়ির কাঁটা ৩টা ৫৫ স্পর্শ করতেই থমকে গেল সব শব্দ। ঢাকের কাঠি নিভে গেল কাঁসরের গায়ে, নিস্তব্ধ হয়ে গেল শব্দযন্ত্র। কোনো প্রশাসনিক আদেশ নয়, কিংবা কোনো ক্ষোভ বা নির্দেশও নয় শতবর্ষের অলিখিত ও প্রথাগত শ্রদ্ধাবোধ থেকে পুরো ম-পজুড়ে নেমে এলো এক স্নিগ্ধ, গভীর নীরবতা।

ঠিক ৪ মিনিট পর, ৩টা ৫৯ মিনিটে একই উঠানের অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এলো পুরান বাজার জামে মসজিদের মুয়াজ্জিনের দরদি কণ্ঠের আহ্বান ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’। মুহূর্তেই বাতাসে দেবীর পূজার ধূপের সুবাসের সঙ্গে মিশে গেল সুগন্ধি আতরের এক অমল আবেশ।

আজান শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট পরই মসজিদে মুসল্লিরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন সালাতে। আর মন্দির প্রাঙ্গণে আগত দর্শনার্থীরা এই নীরবতাকে পরম শ্রদ্ধা জানিয়ে অপলক দাঁড়িয়ে রইলেন। ৪টা ৩০ মিনিটে আসরের সালাত ও মোনাজাত শেষ হতেই যেন মন্দিরের নিভে যাওয়া প্রাণ আবার স্বকীয় ছন্দে ফিরে পেল; পুনরায় বেজে উঠল ঢাক-কাঁসর। লালমনিরহাটের পুরান বাজার এলাকার এই উঠানটি কেবল দুটি উপাসনালয়ের ভৌগোলিক ঠিকানা নয় এটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানবিক বোধ, ভ্রাতৃত্ব ও শ্রদ্ধার এক নিখুঁত কেন্দ্রবিন্দু।

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময় এভাবেই থমকে যায় মন্দিরের সব শব্দযন্ত্র। আজানের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে জামায়াত শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাক-ঢোল, সাউন্ড সিস্টেম ও সাংস্কৃতিক আয়োজন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়।

কালীবাড়ী মন্দিরের সভাপতি ও প্রধান পুরোহিত শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘এটি আমাদের কাছে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম নয়। এটি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের এক সহজাত শিক্ষা। প্রতিটি উৎসবের আগে তা দুর্গোৎসবেই হোক কিংবা ঈদে মসজিদ ও মন্দির পরিচালনা কমিটি এক টেবিলে বসে। ঘড়ির সময় ধরে আজান ও সালাতের সময়সূচি অনুযায়ী আমরা আমাদের অঞ্জলি ও আরতির সময় সাজিয়ে নিই। জন্মের পর থেকে এই উঠানে বিন্দুমাত্র বিশৃঙ্খলা বা ভেদাভেদ দেখিনি।’

ইতিহাস বলছে, ১৮৩৬ সালে এই প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা পায় কালীবাড়ী মন্দিরটি। পরবর্তী সময়ে এলাকাটি ঘিরে যখন ঐতিহ্যবাহী বাজার গড়ে ওঠে, তখন ব্যবসা পরিচালনা করতে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সালাত আদায়ের জন্য মন্দিরের এক কোণে ১৯১৫ সালে একটি ছোট্ট ঘর নির্মাণ করেন। কালের পরিক্রমায় সেই স্থানটিই আজকের ঐতিহ্যবাহী ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’।

সময়ের বিবর্তনে ইট-কাঠের সীমানা বাড়লেও দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের অন্তরের পরিধি বেড়েছে বহুগুণ। কেবল স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন সহাবস্থানের এই বিরল চিত্র দেখতে। এমনকি বিভিন্ন সময় বিদেশি কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতরাও থমকে দাঁড়িয়ে দেখে গেছেন সম্প্রীতির এই মহিমান্বিত রূপ।

পুরান বাজার জামে মসজিদের খতিব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সম্প্রীতির এই চর্চা কোনো প্রদর্শনী নয়, এটি অন্তরের অকৃত্রিম ভালোবাসা। মন্দিরের পরে আমাদের মসজিদ হলেও আমরা কখনো একে অপরের প্রতিপক্ষ ভাবিনি। নামাজের সময় তারা যেমন ঢাক-ঢোল বন্ধ রেখে সুযোগ করে দেন, আমরাও তেমনি তাদের উৎসবের আনন্দ ও নিরাপত্তায় সহযোগী হই। এটাই তো আসল ইসলাম, এটাই প্রকৃত মানবতা।’

এ সম্প্রীতি কেবল প্রবীণদের ধর্মচর্চাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে তরুণ প্রজন্মের মনেও। ঈদ কিংবা পূজা উভয় ধর্মের তরুণরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করেন প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায়।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান এই ঐতিহ্যকে জেলার আত্মপরিচয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ঘড়ির কাঁটা মেপে একই উঠানে আজান ও আরতির এই সুশৃঙ্খল আদান-প্রদান শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের বুকেই শান্তির এক বিরল ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দেয়।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত