কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার উপকূলীয় এলাকার মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত চকরিয়া সুন্দরবনের প্যারাবন উজাড় করা হচ্ছে। গত তিন মাস ধরে চরণদ্বীপ, রামপুর, সওদাগরঘোনা, সাহারবিল, বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্যারাবন কেটে নতুন নতুন চিংড়ি ঘের তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বনভূমি দখল করে এসব ঘের তৈরি করছেন। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এক সময়ের সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন, বাড়ছে উপকূলের পরিবেশগত ঝুঁকি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্যারাবনের গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করা হচ্ছে। কোথাও কাটা গাছ ও গুঁড়ি পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে চিংড়ি ঘের তৈরির প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দখল ও চিংড়ি চাষের কারণে বনটির বড় একটি অংশ হারিয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট প্যারাবনও রক্ষা করা যাচ্ছে না।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা হেফাজতুর রহমান, আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে উপকূলের মানুষকে সুরক্ষা দিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু অবৈধ দখল, ইজারা ও অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে বনটি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। অবশিষ্ট প্যারাবনও ধ্বংস হলে উপকূলীয় জনপদের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
তারা জানান, একসময় এই বনে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, গেওয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। হরিণ, বনবিড়ালসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ছিল এটি। কিন্তু প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরির কারণে বনটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০৩ সালে চকরিয়া সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯২৬ সালের দিকে বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু হয়। ওই সময় কৃষিকাজের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
বনসংশ্লিষ্ট ও পরিবেশসচেতন ব্যক্তিদের মতে, ওই সময় থেকেই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৫০ সালের দিকে প্রায় ২১ হাজার একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার একর সংরক্ষিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে বসতি ও কৃষিকাজের জন্য বনভূমির বিভিন্ন অংশ ইজারা দেওয়া হয়। আশির দশকে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষের বিস্তার ঘটার পর বনভূমি দখলের প্রবণতা আরও বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে বনভূমি দখল করে চিংড়ি ঘের তৈরির অভিযোগও রয়েছে। চিংড়ি ঘের তৈরির জন্য বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়। পরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ করা হয়। এতে ম্যানগ্রোভ গাছপালা, জলজ প্রাণী ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে প্যারাবন উজাড় অব্যাহত থাকলে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
সাহারবিল ও বদরখালী ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেন, প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরি করা ব্যক্তিদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
চকরিয়া সুন্দরবন রক্ষায় উচ্চ আদালতেও আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংরক্ষিত চকরিয়া সুন্দরবনের ২১ হাজার একরের বেশি বনভূমিতে দেওয়া সব ধরনের অবৈধ ইজারা কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল উচ্চআদালত। এরপরও নতুন করে প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরির অভিযোগ ওঠায় বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো বলেন, অবিলম্বে প্যারাবন নিধন বন্ধ, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও অবৈধ ইজারা বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি দখল হয়ে যাওয়া বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। চকরিয়া সুন্দরবনের অবশিষ্ট প্যারাবন রক্ষা করা না গেলে উপকূলের মানুষকে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই বন রক্ষায় শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি।
চকরিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার জলোচ্ছ্বাস, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।