জাপানে প্রবাসীদের দেশের অ্যাম্বাসেডর হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

‘আমাদের প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে দেশের জন্য ভালো কিছু করা। আমরা দেশে থাকি কিংবা বিদেশে থাকি, যে অবস্থানেই থাকি না কেন, আমাদের কোনো কাজের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের ভালো হলে তা করার চেষ্টা করতে হবে।’

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রবাসীদের নিজ নিজ দেশের অ্যাম্বাসেডর বা রাষ্ট্রদূত হিসেবে অভিহিত করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রবাসী এবং দেশে বসবাসকারী সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। 

বুধবার (২৮ অক্টোবর) টোকিওর নিউ ওতানি হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আয়োজিত এক জমকালো ও প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি এই আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। 

মতবিনিময় সভার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক দূরত্ব যাই হোক না কেন, দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ সবার জন্যই উন্মুক্ত।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম পরিকল্পনা হচ্ছে দেশের জন্য ভালো কিছু করা। আমরা দেশে থাকি কিংবা বিদেশে থাকি, যে অবস্থানেই থাকি না কেন, আমাদের কোনো কাজের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষের ভালো হলে তা করার চেষ্টা করতে হবে।’

দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে এর সুফল কেবল দেশের ভেতরে থাকা নাগরিকরাই নন, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীরাও সমানভাবে ভোগ করবেন। প্রবাসে অবস্থানকারী প্রতিটি বাংলাদেশিকে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে দেশের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

সভায় প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান যে, বর্তমান সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো শিক্ষার শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত করতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ে জাপানি, জার্মান এবং ফরাসি ভাষার মতো জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ চালু করার পরিকল্পনা চলছে।

তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী যেকোনো একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং আগামী বছর থেকেই দেশের স্কুলগুলোতে জাপানি সহ কয়েকটি বিদেশি ভাষা শিক্ষাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রবল প্রত্যাশা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র গতানুগতিক পাঠ্যবই বা মুখস্থ বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষায় দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে দক্ষ করে তোলা গেলে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুবিধা লাভ করবে।

স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুরা যাতে মানসম্মত চিকিৎসা পায়, সে লক্ষ্যে বড় ধরনের সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৫০টি করে শয্যা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই শয্যাসংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১৫০টিতে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু করা হবে। এছাড়া নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যার ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর জেলা বা বিভাগীয় শহরে কষ্ট করে ছুটতে হবে না। প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি শক্তিশালী করা গেলে বিভাগীয় বা বড় শহরের প্রধান হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীরা দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। এই উদ্দেশ্যে গ্রাম পর্যায়ে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসচেতনতা পৌঁছে দিতে দেশব্যাপী এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অন্তত ৮০ শতাংশ নারী নিয়োগ দেওয়া হবে। নির্বাচিত স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ, পুষ্টির সঠিক ব্যবহার, এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো নীরব ঘাতক রোগগুলো প্রতিরোধ করার উপায় সম্পর্কে সচেতন করবেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপনের প্রবণতা বাড়বে, সামগ্রিকভাবে রোগের প্রকোপ কমবে এবং জাতীয় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সর্বাগ্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। জাপানে গমনকারী কর্মীদের শুধু পেশাগত কাজ নয়, বরং দেশটির ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক শিষ্টাচার সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়ে পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে জাপানি নিয়োগকর্তাদের কাছে বাংলাদেশিদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, জাপানি ভাষা শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকারিভাবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও আশানুরূপ আবেদন পাওয়া যায়নি। জাপানি ভাষায় দক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন, তবে তাদের অভিজ্ঞতাকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কাজে লাগানোর কার্যকর পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।

জাপান বিএনপি ও প্রবাসী কমিউনিটির শীর্ষ স্থানীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত সভার সভাপতি ছিলেন জাপান বিএনপির সভাপতি মীর রেজাউল করিম রেজা।

সভার শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রবাসে হাজার মাইল দূরে বসবাস করলেও প্রত্যেকেই বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা বিস্তার, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ক্ষেত্রগুলোতে প্রবাসীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

‘নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমেই প্রকৃত দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে,’ এই বার্তা দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তার দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য শেষ করেন।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত