গ্রাহকের দোরগোড়ায় আধুনিক, নিরাপদ ও সময় সাশ্রয়ী বাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি। এ লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, নিজস্ব এআই মডেল তৈরি, ডিজিটাল ঋণসেবা সম্প্রসারণ এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলী খান।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনাদের ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান কী? কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে?
শওকত আলী খান : ডিজিটাল বাংকিং সেবা সম্প্রসারণে সোনালী ব্যাংক পিএলসি ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ক্যাশলেস ব্যাংকিংয়ের প্রসারেও আমরা অগ্রগতি অর্জন করেছি। ঘরে বসে বাংকিং সেবা নিতে গ্রাহকদের জন্য রয়েছে সোনালী ই-ওয়ালেট। পাশাপাশি সোনালী করপোরেট ইন্টারনেট ব্যাংকিং, সোনালী পেমেন্ট গেটওয়ে, সোনালী ই-সেবা, সোনালী বিল পেমেন্ট সিস্টেম, স্বাধীন ক্যাশ ও ডিজিটাল ন্যানো ঋণের মতো সেবা চালু রয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকদের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত করতে আপনাদের বিশেষ উদ্যোগ কী? গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের নীতিমালা কী বা তথ্যের গোপনীয়তা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?
শওকত আলী খান : গ্রাহকদের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পাশাপাশি উদ্ভাবনী উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে গ্রাহকদের উৎসাহিত করা, লেনদেন সহজ ও নিরাপদ করা এবং ক্যাশলেস ব্যাংকিংয়ের প্রসার আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণা বা অনাকাক্সিক্ষত সমস্যার অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য সোনালী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রাহকরা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে অনলাইনে এবং কল সেন্টারের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তথ্যের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুধাপের পরিচয় যাচাই বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (এমএফএ) ব্যবহার করা হয়। বিশেষ প্রয়োজনে ডিজিটাল লেনদেনে বায়োমেট্রিক যাচাইও নিশ্চিত করা হয়।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে প্রধান বাধাগুলো কী কী?
শওকত আলী খান : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের একটি অংশের ডিজিটাল সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রতারণার ঝুঁকি, ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল সেবার প্রতি আস্থার অভাব উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাড়ানো এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় করাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে আপনার ব্যাংক কী পরিমাণ বিনিয়োগ করছে?
শওকত আলী খান : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সোনালী ব্যাংকে ‘আইটি সিকিউরিটি, আইটি রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফ্রড কন্ট্রোল ডিভিশন’ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে। এ বিভাগের কর্মকর্তারা ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকের ডিজিটাল নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রম তদারকি করেন। ব্যাংকের নিজস্ব দক্ষ জনবলের মাধ্যমে বিভিন্ন সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা যাচাই ও অনুপ্রবেশ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরাই সর্বপ্রথম টিয়ার-৩ ডিজাইন ডকুমেন্টস এবং টিয়ার-৩ নির্মিত স্থাপনার সনদ অর্জন করেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যাংকিং সেবায় সোনালী ব্যাংকে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে?
শওকত আলী খান : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যাংকিং সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ, দক্ষ ও নিরাপদ করে তুলছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন, ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা সম্ভব। সোনালী ব্যাংকেও এআইভিত্তিক বাংকিং সেবা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে আইটি নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সার্বক্ষণিক ডিজিটাল নিরাপত্তা তদারকি করে। ব্যাংকের নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে সফটওয়্যারের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বুয়েট ও বিসিসির সহায়তাও নেওয়া হয়।
সোনালী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
শওকত আলী খান : আগামী দিনে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এআই ও তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক সেবা চালু, নিজস্ব এআই মডেল তৈরি এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে আমরা কাজ করছি। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।