ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মোবাইল আর্থিক সেবা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এলেও প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা ও গ্রাহক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক সেবার সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো প্রয়োজন।
টেলিকম, আর্থিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মো. ফিরোজ কবির মনে করেন, এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার ব্যাংকিং সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করতে পারে। তবে প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে প্রতারণা, তথ্য চুরি, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ও ফিশিংয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, বাংলা কিউআর, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং আর্থিক লেনদেনের ধরন বদলে দিয়েছে। নতুন ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগও এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে সেবার পরিধি বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংকিং খাতে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক জালিয়াতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণ মূল্যায়নের বাইরে বিকল্প তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন গ্রাহকদের ঋণযোগ্যতা যাচাইয়েও এ প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক চ্যাটবট ও কণ্ঠসেবা চালুর মাধ্যমে গ্রাহকদের দ্রুত সেবা দেওয়া এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক পণ্য প্রস্তাব করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) দ্রুত ও কম খরচে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ তৈরি করেছে। কেনিয়ার এম-পেসা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক এআই ব্যবহারের মাধ্যমে জালিয়াতি প্রতিরোধ ও গ্রাহকসেবা উন্নয়নে কাজ করছে। যুক্তরাজ্যের মনজো ও রিভোলুট শাখানির্ভরতার বাইরে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্ভাবনা দেখিয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিলের পিক্স দ্রুত লেনদেনের জনপ্রিয় একটি ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি গ্রাহকের আস্থা। এ আস্থা বজায় রাখতে ব্যাংকগুলোকে বহুমাত্রিক পরিচয় যাচাই, বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা চালু রাখতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরি জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু প্রযুক্তি স্থাপন নয়, সম্ভাব্য হামলা শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো এবং সেবা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, নারী ও বয়স্কদের অনেকে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। প্রতারণার ভয় এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ পরিস্থিতিতে স্কুল ও মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমে আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংকের এজেন্ট ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। সহজ বাংলায় এবং কণ্ঠনির্ভর শিক্ষা উপকরণ তৈরি করলে স্বল্পশিক্ষিত ও নিরক্ষর মানুষের কাছেও প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে। নারী উদ্যোক্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পিন ও এককালীন পাসওয়ার্ড (ওটিপি) সুরক্ষা, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ লেনদেনের নিয়ম সম্পর্কে নিয়মিত প্রচার চালাতে হবে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয়, ঋণ, বীমা ও সরকারি ভাতা গ্রহণের সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক, আর্থিক প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এআই এবং সাইবার নিরাপত্তায় সমান গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং তৃণমূল পর্যায়ে আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।