ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বড় ঝুঁকি আর্থিক প্রতারণা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে সাইবার হামলা ও আর্থিক প্রতারণা। ফিশিং, তথ্য চুরি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলতাফ হুসাইন। তার মতে, নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ও গ্রাহকের সচেতনতা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময়ের পেশাজীবনে ইনভেস্টমেন্ট, ফরেন ট্রেড এবং জেনারেল ব্যাংকিংয়ে নেতৃত্বে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

বর্তমান সময়ে দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকিগুলো কী কী?

আলতাফ হুসাইন : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু সাইবার হামলা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলা করা। ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, তথ্য চুরি, পুরনো প্রযুক্তির দুর্বলতা এবং তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তাঝুঁকি ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পাশাপাশি দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের ঘাটতি এবং গ্রাহকের অসচেতনতাও দায়ী। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, তথ্যের যাচাই-বাছাই, সার্বক্ষণিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। আমাদের লক্ষ্য ডিজিটাল ব্যাংকিংকে শুধু সহজ ও দ্রুত নয়, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও গ্রাহকের আস্থার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারে সচেতনতার ঘাটতি কীভাবে সাইবার ঝুঁকি বাড়ায়?

আলতাফ হুসাইন : গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে সাইবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা, ভুয়া লিংকে ক্লিক করা, পরিচয় জালিয়াতি, অপরিচিত অ্যাপ, পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং অনিরাপদ ডিভাইসে লেনদেনের ফলে প্রতারকরা গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক তথ্যের নাগাল পেতে পারে। এ ছাড়া প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে সাইবার অপরাধীদের ফাঁদে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে সামাজিক কৌশলে গ্রাহককে প্রতারিত করাই অপরাধীদের প্রধান হাতিয়ার। তাই নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিং নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি গ্রাহকের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, পিন ও ওটিপি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে চাইলেও এগুলো শেয়ার করা যাবে না।

কোর ব্যাংকিং সিস্টেম এবং থার্ড পার্টি ভেন্ডরদের মাধ্যমে সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলো কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

আলতাফ হুসাইন : ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ইআইবিএস ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা সিস্টেমের নিরাপত্তা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা শনাক্তকরণের ওপর গুরুত্ব দিই। পাশাপাশি থার্ড পার্টি ভেন্ডরদের নিরাপত্তা সক্ষমতা মূল্যায়ন, দ্রুত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অগ্রাধিকার হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কার্যকর সাইবার নিরাপত্তার সমন্বয়ে গ্রাহকের তথ্য, লেনদেন এবং আস্থা সুরক্ষিত রাখা।

ব্যাংকিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহারের যেমন সুফল রয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে নতুন ধরনের জালিয়াতি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকের কৌশল কী?

আলতাফ হুসাইন : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা জোরদারের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তবে সাইবার অপরাধীরা ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং ও স্বয়ংক্রিয় ফিশিংয়ের মাধ্যমে জালিয়াতির নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংক এর বিদ্যমান কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ইআইবিএস ও ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেলের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর রাখতে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্তকরণ, বহুমাত্রিক পরিচয় যাচাই ও ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, সম্ভাব্য আক্রমণের ঝুঁকি যাচাই, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং গ্রাহকদের নতুন ধরনের ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়। আমাদের কৌশল হলো প্রযুক্তির ডেভেলপমেন্ট কাজে লাগিয়ে সাইবার ঝুঁকি আগাম শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রাহকের তথ্য, লেনদেন ও আস্থা সুরক্ষিত রাখা।

ফিশিং, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ওটিপি বা পিন হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলো রোধে প্রযুক্তিগত কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে?

আলতাফ হুসাইন : ফিশিং, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ওটিপি-পিন জালিয়াতি প্রতিরোধে সিম বাইন্ডিং, মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, ডিভাইস ফিঙ্গারপ্রিন্টিং, বহুমাত্রিক পরিচয় যাচাই এবং এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম জালিয়াতি শনাক্তকরণ কার্যকর প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা। পাশাপাশি সিম সোয়াপ শনাক্তকরণ, অস্বাভাবিক লেনদেনে যাচাই-বাছাই, রিমোট অ্যাক্সেস ও স্ক্রিন শেয়ারিংয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং ওটিপি বার্তায় স্পষ্ট সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে থাকে এবং গ্রাহক সচেতনতা জোরদার করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করে থাকে। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির সহায়তায় জালিয়াতির ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা, গ্রাহকের আর্থিক তথ্য ও লেনদেন সুরক্ষিত রাখা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আস্থা আরও সুদৃঢ় করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইনগুলো আপনার ব্যাংক কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছে? এতে ঘাটতিগুলো কী? 

আলতাফ হুসাইন : বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাইবার সিকিউরিটি গাইডলাইন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছে। ইসলামী ব্যাংক সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা প্রতিপালনের বিষয় হিসেবে নয় বরং গ্রাহকের আস্থা, আর্থিক তথ্যের সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য আইসিটি সিকিউরিটি গাইডলাইন ও সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর আলোকে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। 

সাইবার হামলার শিকার হলে তা দ্রুত শনাক্তকরণ এবং রিকভারির ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ রেসপন্স টিম কী কী ব্যবস্থা নেয়?

আলতাফ হুসাইন : সাইবার হামলার ঘটনা দ্রুত শনাক্ত ও মোকাবিলায় কার্যকর ইনসিডেন্ট রেসপন্স ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত হলে আক্রান্ত সিস্টেম বিচ্ছিন্ন করা, হামলার উৎস ও প্রভাব বিশ্লেষণ, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপদ ব্যাকআপ থেকে তথ্য ও সিস্টেম পুনরুদ্ধার, সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী ঝুঁকি প্রতিরোধে নিরাপত্তা দুর্বলতা পর্যালোচনা করা হয় যাতে দ্রুত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদে ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং গ্রাহকের আস্থা অক্ষুন্ন রাখা যায়।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপেন ব্যাংকিং এবং ক্লাউড-বেসড ব্যাংকিংয়ের যুগে সাইবার সিকিউরিটির ধরন কীভাবে বদলাচ্ছে?

আলতাফ হুসাইন : ওপেন ব্যাংকিং ও ক্লাউডভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রসারে সাইবার নিরাপত্তা এখন প্রচলিত সিস্টেম সুরক্ষার গন্ডি ছাড়িয়ে পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শক্তিশালী পরিচয় যাচাই, তথ্য এনক্রিপশন, ক্লাউড অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এআইনির্ভর নজরদারি ও রিয়েল টাইম ঝুঁকি শনাক্তকরণ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করছে। ভবিষ্যতের ব্যাংকিংয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার পাশাপাশি গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা, সিস্টেমের স্থিতিশীলতা ও আস্থা নিশ্চিত করাই হবে সাইবার নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। 

সাধারণ গ্রাহক এবং ব্যাংক উভয়ের জন্য আপনার সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত মূল পরামর্শ কী থাকবে?

আলতাফ হুসাইন : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েরই সম্মিলিত দায়িত্ব। গ্রাহকদের কখনোই পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। সন্দেহজনক লিংক, কল ও বার্তা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা, সার্বক্ষণিক ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি সুরক্ষা দেয়, সচেতনতা ঝুঁকি কমায়; আর আস্থা তৈরি হয় দুটির সমন্বয়ে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত