ডিজিটাল ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ সাইবার নিরাপত্তা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

ব্যাংকের শাখায় যাওয়া ছাড়াই সেবা পাওয়া, ঘরে বসে টাকা জমা, স্থানান্তর ও ঋণ নেওয়ার সুযোগ গ্রহণ ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে গ্রাহকের সামনে এমন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী এর সুফল পেতে পারে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে সাইবার নিরাপত্তা। গ্রাহকের তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে হিসাব খোলা ও অননুমোদিত লেনদেনের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি কঠিন হবে।

২০২৩ সালে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও নীতিমালা সংশোধনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে প্রক্রিয়া। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক সম্মতিপত্র দেওয়া হয়। তবে প্রাথমিক অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম শুরু করা যাবে না। নির্ধারিত শর্ত পূরণ ও চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার পরই ব্যাংকগুলো সেবা চালু করতে পারবে।

ডিজিটাল ব্যাংক চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে ও কম খরচে ব্যাংকিং সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু শুধু অ্যাপ তৈরি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই এ উদ্যোগ সফল হবে না। গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং প্রতারণার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব শাখা, উপশাখা, এটিএম বা সরাসরি কাউন্টার থাকবে না। মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহককে সেবা দেবে এসব ব্যাংক। ফলে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে লেনদেন, অর্থ স্থানান্তর ও অন্যান্য কার্যক্রমের বড় অংশই প্রযুক্তিনির্ভর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। তবে মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই এবং ঝুঁঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলোর সামনে এখন বড় কাজ হলো নিরাপদ প্রযুক্তি-অবকাঠামো তৈরি করা। সার্বক্ষণিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ, অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকানো এবং কোনো কারণে সেবা বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত তা সচল করার প্রস্তুতি থাকতে হবে।

ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি সাইবার অপরাধ। প্রতারকরা ভুয়া ফোন, বার্তা, ওয়েবসাইট কিংবা ক্ষতিকর অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। পাসওয়ার্ড বা এককালীন গোপন সংকেত চুরি করে হিসাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকের তথ্যভা-ারে হামলা হলে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও লেনদেনের বিবরণ চুরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো ব্যাংকের সার্ভার বা নেটওয়ার্কে বড় ধরনের সমস্যা হলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন। এতে ব্যক্তিগত লেনদেনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তিসেবার দুর্বলতাও ঝুঁকি বাড়ায়। ডিজিটাল ব্যাংক বিভিন্ন সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা ও অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। এসব ব্যবস্থার কোনো দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা ব্যাংকের নেটওয়ার্কে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে।

ব্যাংকিং খাতে সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ‘সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ভার্সন ১.০’ জারি করেছে। ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ জারি করা এই কাঠামোয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়নের সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যাংকিংয়ের সেবা-কাঠামোয় সাইবার ঝুঁকি শনাক্ত করা, তথ্য ও নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখা, হামলা দ্রুত শনাক্ত করা, ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিসেবা সরবরাহকারীদের নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। কারণ, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি থাকলে গ্রাহকের অর্থ ও তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে একটি ব্যাংকের ওপর সাইবার হামলার ঘটনা পুরো ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বড় সুযোগ হলো ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা। প্রচলিত ব্যাংকের শাখা স্থাপন ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো কঠিন। ডিজিটাল ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিজিটাল ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাংকের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে নতুন ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরও ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ লেনদেনের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানেরয মতে, ডিজিটাল আর্থিক সেবা পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সুবিধা না পাওয়া জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে ঋণ বিতরণে সতর্কতা ও গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করাটাও জরুরি বলে মনে করেন।

প্রচলিত ব্যাংকে গ্রাহক সমস্যায় পড়লে শাখায় গিয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। কিন্তু শাখাবিহীন ব্যাংকে অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের ব্যবস্থাও হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর। অননুমোদিত লেনদেনের অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং গ্রাহককে অগ্রগতি জানানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।

তবে ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলেই প্রচলিত ব্যাংকের প্রয়োজন শেষ হবে না। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে ছোট অঙ্কের লেনদেন, সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র ঋণের মতো সেবা সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ বিতরণ করলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ডিজিটাল ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে অনুমোদন ও কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত