উন্নয়ন সহযোগিতা পেরিয়ে বাণিজ্য-বিনিয়োগে জোর

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নয়ন এবং সেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান। দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই গতকাল বুধবার জাপানের টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ আগ্রহের কথা জানান।

আকাজাওয়া রিয়োসেই বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নয়ন এবং দেশটিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে জাপান আগ্রহী। 

বৈঠকে জাপানি ব্যবসায়ী মহলে বাংলাদেশের প্রতি বিদ্যমান বিনিয়োগ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে আরও জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপ শীর্ষক পৃথক একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগ করতে দেশটির ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এ সংলাপের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। তবে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম।

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি আমেরিকান ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। দুদেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চাই।’

তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।

জ্বালানি খাতে তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

তৃতীয় ভাষা শেখায় গুরুত্ব : জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন বাংলাদেশ কমিউনিটির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা শহরকেও টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ঢাকাসহ সারা দেশকে পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

টোকিওর হোটেল নিউ ওতানিতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রবাসী ও দেশে বসবাসকারী সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে দেশে ও প্রবাসে থাকা সব বাংলাদেশিই এর সুফল পাবেন।

প্রবাসীদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

স্কুলে জাপানিসহ তৃতীয় ভাষা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানি,  জার্মান, ফরাসিসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখা হবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একটি ভাষা বেছে নিতে পারবে।

তিনি বলেন, কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং দেশটির সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে পাঠানোর চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ অন্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। জাপান বিএনপির সভাপতি মীর রেজাউল করিম রেজা মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন।

স্মারক-চুক্তি-অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক, দুটি অনুদান চুক্তি ও একটি অভিপ্রায়পত্র সই হয়েছে।

টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসে গতকাল বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এ বিষয়টি জানান। চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে টহলজাহাজ সরবরাহে অনুদান, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, পরিবেশের উন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তি ও সমঝোতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

চার দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী গত ২৬ অক্টোবর টোকিও পৌঁছান। সফর শেষে আজ বৃহস্পতিবার দেশের উদ্দেশে টোকিও ত্যাগের কথা রয়েছে।

২৯ কোটি ৫৫ লাখ আমেরিকান ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি : প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীনের উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ আমেরিকান ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।

এ ছাড়া বাংলাদেশকে উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দেওয়ার চুক্তি হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত