দেশে উচ্চশিক্ষায় আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কতটা ভূমিকা রাখছে?
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইউআইইউ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা ও দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনে ইউআইইউ অবদান রাখছে।
আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স ও রোভার প্রতিযোগিতায় ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের সাফল্য দেশের সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে। যেমন - ইউআইইউ মার্স রোভার টিম যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ইউআরসি ২০২৬ প্রতিযোগীতায় বিশ্বব্যাপী তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন এবং ইউআইইউ এরিয়াল রোবোটিক্স টিম (ইউএআরটি) যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস (এসইউএএস) ২০২৬ প্রতিযোগিতায় বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে পাঠ্যক্রমে কী পরিবর্তন আনছেন?
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা বিবেচনায় পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং, অটোমেশন, সাইবার সিকিউরিটি ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করা হচ্ছে। যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও অন্যান্য সফট স্কিলের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা এবং কর্পোরেট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ইউআইইউর পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য দক্ষ ও প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতের উন্নয়নে কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে?
ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের মানোন্নয়নেও কাজ করে থাকে। শিক্ষকদের জন্য প্রতি সেমিস্টারে ইনডাকশন ট্রেনিং এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। গবেষণার জন্য শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরও নানা ভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য ইউআইইউ’র গবেষণা কেন্দ্র ও ইনোভেশন হাব ফ্রি ব্যবহার করতে পারে। এখন অনলাইন জার্নালে গবেষণাপত্র পাবলিশ করা ব্যয় বহুল; ডলার রেট বাড়ার কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অত্র বিশ্ববিদ্যালয় এই খরচের পুরোটাই বহন করে থাকে। দ্বিতীয়ত, কিউ১ ও কিউ২ জার্নালে প্রকাশনার জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে ২৫ হাজার টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, গবেষণা এবং নেতৃত্ব বিকাশে কী বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন?
ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। তাদের বাস্তব সমস্যা সমাধান, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে গবেষণা প্রকল্প, বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হয়। এখানে শিক্ষার্থীরা রোবোটিক্স, রোভার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সফটওয়্যার ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ, মেট রোভ, ক্যানস্যাট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশীপ এবং রোবোকাপ রেসকিউ লিগ’র মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক সুযোগ ও পরিবেশ পেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের উদ্ভাবন করতে সক্ষম।
শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনে বিশ্ববিদ্যালয় কী ধ ভূমিকা পালন করছে?
চাকরির বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী গ্রাজুয়েট তৈরীতেও ইউআইইউ বদ্ধপরিকর। ইউআইইউ শিক্ষার্থীদের কর্মজীবন শুরুর জন্য বিভিন্ন কর্পোরেট এক্সপার্টদেরকে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, ওয়ার্কশপ এবং সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়। সিভি রাইটিং, মক ইন্টারভিউ, কেস স্টাডি এবং সফট স্কিলস, যেমন- কমিউনিকেশন স্কিল, নেগোসিয়েশন স্কিল এবং প্রোব্লেম সলভিং স্কিলসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আমরা বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের জব ফেস্টিভ্যাল এবং ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ’র মাধ্যমে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান গুলোতে সরাসরি চাকুরীর প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকি। যার ফলশ্রুতিতে ইউআইইউ গ্রাজুয়েটরা দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে শিক্ষকতা এবং বড় কর্পোরেট হাউজে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। আমেরিকা, কানাডা, ইতালিসহ ইউরোপের শীর্ষ কর্পোরেটের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত আছে, যেমন- আমাজন, গুগোল, মাইক্রোসফ্ট, ভিসা ইত্যাদি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান, গবেষণার প্রভাব, শিক্ষার পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে র্যাঙ্কিংই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মানের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল, গবেষণার মাধ্যমে সমাজের সমস্যার সমাধান, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা র্যাঙ্কিংকে কেবল অবস্থানগত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি না, বরং এটি আমাদের শিক্ষার মান ও গবেষণার উৎকর্ষ বাড়ানোর একটি মানদন্ড-মাধ্যম মাত্র।
র্যাঙ্কিংয়ের জন্য কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও সূচকে পার্থক্য আছে। এসব সূচকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক কেমন?
কিউএস এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়ন করে থাকে। কিউএসের মূল্যায়নে শিক্ষাবিদদের মতামত, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি এবং আন্তর্জাতিকীকরণের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে, টিএইচই শিক্ষাদান, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার মান, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো বিষয় বিবেচনা করে। এই সূচকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। তবে সব সূচক শিক্ষার প্রকৃত মান বা গবেষণা কার্যক্রম পরিপূর্ণভাবে উঠে আসে না। আমাদের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি গবেষণার মৌলিকত্ব, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নে অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, জার্নাল সাবস্ক্রিপশন, ডেটাবেস এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা প্রয়োজন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কী কী সুবিধা আছে?
গবেষণায় বিনিয়োগ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা-সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ইউআইইউতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানের ব্যবস্থা চালু আছে। ইউআইইউ বার্ষিক কয়েক কোটি টাকা গবেষণা অনুদান দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ (আইএআর) এর মাধ্যমে গবেষণা প্রকল্প, প্রকাশনা, গবেষণাপত্র সম্পাদনা ও প্রস্তুতির জন্য সহায়তার করা হয়। গবেষণার জন্য বিশেষ ছুটি এবং পূর্ণকালীন গবেষণা-সহকারীর সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে।
ইউআইইউতে গবেষণার জন্য বিভিন্ন বিভাগীয় গবেষণাগার, বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এর আওতায় ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ (এআইআর), ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ, ইনোভেশন, ইনকিউবেশন অ্যান্ড কমার্শিয়ালাইজেশন (আইরিক), সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ (সিইআর) এবং সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স (সিএআইআর) সহ দশটির বেশি গবেষণা সেন্টার রয়েছে। এসব অবকাঠামো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, জ্বালানি, ব্যবসা ও অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত গবেষণাকে সহায়তা করে।
বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ অন্তর্ভুক্ত আছেন কি? যদি থাকেন, তিনি কী বিষয়ে কাজ করেন?
ইউআইইউ’র ৬ জন শিক্ষক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতিতে বিশ্বের সেরা ২% বিজ্ঞানীর তালিকায় বেশ কয়েক বার স্থান করে নিয়েছে। আর্থিক উদ্ভাবন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি এবং টেকসই অর্থায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ভাস্কুলার জীববিজ্ঞান, প্রদাহ ও ফার্মাকোলজি এবং প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী অবদানের জন্য তারা এই অসাধারণ সম্মান পেয়েছেন। তাঁদের পরিচিতিতে এ স্বীকৃতির ভিত্তি হিসেবে স্কোপাসের গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতিসংক্রান্ত তথ্যের কথা উল্লেখ করা আছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন।