বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিংকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি আয়না, উন্নয়নের দিকনির্দেশক। এটি চূড়ান্ত পরিচয় নয় বা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যের বিকল্প নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে তার অবস্থান উন্নত করতে হবে তার শিক্ষার মান, গবেষণার উৎকর্ষ, শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং সমাজে অবদানের ওপর ভিত্তি করে, শুধু সূচক পূরণের কৌশলে নয়।
র্যাংকিংয়ের জন্য কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনসহ (টিএইচই) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও সূচকে পার্থক্য আছে। এসব সূচকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক কেমন?
র্যাংকিং পদ্ধতি ও সূচকে পার্থক্য থাকায় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দুটি সূচকে ভিন্ন হতে পারে। কিউএস একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতার মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে টিএইচই শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার মান, গবেষণার প্রভাব ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করে। এসব সূচকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, তবে সম্পূর্ণ নয়। গবেষণার উদ্ধৃতি, প্রকাশনার মান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গবেষণার উৎকর্ষের কার্যকর নির্দেশক হতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মান, গবেষণার মৌলিকতা, নৈতিকতা এবং সমাজে গবেষণার বাস্তব প্রভাব কেবল র্যাংকিং দিয়ে পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। তাই, র্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মূল্যায়নের একটি সহায়ক নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে নয়।
র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনে আন্তর্জাতিক গবেষণা-সহযোগিতা, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি, একাডেমিক সুনাম ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থান কেমন? সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?
যে ৪টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর আলোকে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র এ রকম ইউএনআইর্যাঙ্কস (২০২৭) বিশ্বে ৬,১৮৬, বাংলাদেশে ৪২; টিএইচই ইমপেক্টস (২০২৬) বিশ্বে ১০০১-১৫০০ ব্যান্ড, দেশে ১৩তম, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯ম। ইউআই গ্রিনমেট্রিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশে ৭ম, যা পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে আমাদের অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ গবেষণা ও প্রকাশনায় গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে, যার ফলে প্রতি বছর পিয়ার-রিভিউড আর্টিকেল ও তার উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচ-ইনডেক্স ৪০।
এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন শিক্ষক র্যাংকড বিজ্ঞানী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছেন। গত কয়েক বছরে বেশকিছু দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ হয়েছে। এর ফলস্বরূপ ইতিমধ্যে স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ, যৌথ গবেষণা ও প্রকাশনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া চলমান।
আমাদের মূল শক্তির জায়গা বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী জ্যেষ্ঠ ফ্যাকাল্টিরা, যারা নতুন প্রজন্মের ফ্যাকাল্টিদের গবেষণায় উদ্ভূত করছেন প্রতিনিয়ত। আমাদের আছে অত্যাধুনিক ল্যাব ও আধুনিক লাইব্রেরি।
র্যাংকিংয়ের মেট্রিক্স এবং ডেটার আলোকে আমাদের ৩টি প্রধান দুর্বলতা হলো গবেষণা প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতির সংখ্যা অপ্রতুল, আন্তর্জাতিকীকরণে ঘাটতি এবং ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণার অপর্যাপ্ততা।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক বাজেটের কত শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়? গবেষণার জন্য ছুটি, তহবিল (সিড গ্র্যান্ট) ও পূর্ণকালীন গবেষণা-সহকারীর মতো ব্যবস্থা কী কী আছে?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করায় আবকাঠামোগত উন্নয়নে আমরা সর্বাধিক জোর দিচ্ছি। তারপরও গত কয়েক বছরে আমরা বার্ষিক বাজেটের ২ শতাংশের বেশি গবেষণায় ব্যয় করেছি। আমরা শিক্ষকদের গবেষণার জন্য ছুটি এবং ক্ষেত্র অনুযায়ী তহবিল প্রদান করি। এ ছাড়া শিক্ষকদের গবেষণা ও প্রকাশনার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত বার্ষিক আয়োজনের মাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়।
মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, জার্নাল সাবস্ক্রিপশন, ডেটাবেস এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা প্রয়োজন। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী সুবিধা আছে?
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে মানসম্পন্ন গবেষণার ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত। তবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের মানদণ্ডে প্রথম সারিতে যেতে হলে আরও কিছু উন্নয়নের দরকার। বর্তমানে এসইউবিতে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরি আছে। আমাদের ইন্টারনেট ও ক্যাম্পাস ওয়াইফাই তথা ডিজিটাল রিসোর্স উন্নত, তবে আরও আধুনিকায়নের কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্প থেকে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় গত পাঁচ বছরে গবেষণার জন্য আর্থিক সহায়তা পেয়েছে কি?
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিয়মিত গবেষণা অনুদান সংগ্রহ করে থাকে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত আধুনিক গবেষণার জন্য এই অনুদান একেবারেই অপর্যাপ্ত। বার্ষিক জাতীয় বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য সরকারের পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকা উচিত।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি গবেষণার উদাহরণ দিন, যেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ, নীতিগত প্রভাব এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আছে?
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের অনেক গবেষণা ফলাফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন : ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নানা ধরনের ফল আম, কাঁঠাল, আনারস গুণগতমান অপরিবর্তিত রেখে সারা বছর সংরক্ষণ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। কাঁঠালের জুস, নিউট্রিশিয়াস কুকিজ ইত্যাদি সফলভাবে তৈরি করেছে, যার যথেষ্ট বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। ফলের রসের নিরাপত্তা ও গুণমান উন্নয়নে নন-থার্মাল পদ্ধতি আবিষ্কার। ফার্মাসি বিভাগে ক্যানসারের ওষুধের ওপর গবেষণা হয় নিয়মিত। পাশাপাশি ঔষধি গুণসম্পন্ন বিভিন্ন ভেষজকে আধুনিক ডোজেস ফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারের নানান পদ্ধতি উদ্ভাবন করে থাকে। এসব হার্বাল ফর্মুলেশনের ব্যাপক রপ্তানি চাহিদা রয়েছে।