লক্ষ্য হোক জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণার সততা, মানসম্মত শিক্ষা

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৬ এএম

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কত নম্বরে আছে, সেটাই কি তার সাফল্যের শেষ কথা? বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং নিয়ে আগ্রহ এখন সর্বত্র। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার সময় র‌্যাংকিং দেখেন, গবেষকরা খোঁজেন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাংকিংকে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্যও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু আমার বিবেচনায়, র‌্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক, চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার মৌলিকত্ব, জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা, মানবসম্পদ উনয়ন এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদানের ওপর।

বিশ্বে বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ের মধ্যে কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) র‌্যাংকিং সমাদৃত। তারা মূল্যায়ন করে একাডেমিক সুনাম, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি, গবেষণার উৎপাদনশীলতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতির মতো সূচকে। কিউএস র‌্যাংকিং ২০২৭-এ বাংলাদেশের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে ৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে টিএইচই ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২৭-এর মূল তালিকায় বাংলাদেশের ৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে। এ ছাড়া, ২০২৬ সালের টিএইচই ইমপ্যাক্ট র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। তবে প্রতিটি র‌্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও সূচকের ওজন আলাদা। কোনোটি গবেষণার প্রভাবকে, কোনোটি সামাজিক অবদান, টেকসই উন্নয়ন বা আন্তর্জাতিকীকরণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় এক র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থেকে অন্যটিতে পিছিয়ে থাকতে পারে। শুধু অবস্থান দেখে সামগ্রিক মান বিচার করা যায় না। আবার র‌্যাংকিং অপ্রয়োজনীয়ও নয়। এটি দুর্বলতা শনাক্ত করতে, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে এবং বৈশি^ক মানের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে সাহায্য করে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত র‌্যাংকিংয়ের জন্য কাজ করা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা, স্বীকৃত গবেষণা ও কার্যকর উদ্ভাবনের এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেবে।

গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (জিইউবি) ২০২৫ সালের টিএইচই ইমপ্যাক্ট র‌্যাংকিংয়ে ছিল ৬০১-৮০০ ব্যান্ডে। ২০২৬ সালে এক ধাপ এগিয়ে এখন ৪০১-৬০০ ব্যান্ডে, যেখানে বিশে^র ১১৬টি দেশের ১,৬৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নিয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জিইউবির অবস্থান তৃতীয়।

র‌্যাংকিংয়ের সাফল্যকে গবেষণার সব ক্ষেত্রে সমান উৎকর্ষের প্রমাণ ভাবা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি, মৌলিক গবেষণার সংখ্যা, যৌথ আন্তর্জাতিক প্রকল্প, গবেষণা থেকে উদ্ভাবন এবং শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতায় আমাদের ধারাবাহিক উন্নতি দরকার। দেশীয়, সরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

গবেষণাকে উৎসাহিত করতে জিইউবিতে রিসার্চ গ্রান্ট প্রদানসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু আছে। ইউজিসি নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের ২% গবেষণায় ব্যয়ে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে দীর্ঘমেয়াদে আরও এগোতে হলে অভ্যন্তরীণ সিড গ্র্যান্ট, গবেষণা প্রণোদনা, পূর্ণকালীন গবেষণা-সহকারী, আধুনিক পরীক্ষাগার, বৈজ্ঞানিক সফটওয়্যার ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা আরও শক্তিশালী করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, কম্পিউটার ভিশন, জীববৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রকৌশল গবেষণায় উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ ডিগ্রি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও দীর্ঘমেয়াদিদ অংশীদারত্ব গড়তে হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে অনেক পথ এগোতে হবে। কেবল প্রকাশনার সংখ্যা নয়, গবেষণার মান বুঝতে মৌলিকত্ব, পদ্ধতিগত নির্ভরযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি, বাস্তব প্রয়োগ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে অবদানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আসল প্রশ্ন হলো, গবেষণা মানুষের জীবন উন্নত করছে কি না, শিল্পের সমস্যা মেটাচ্ছে কি না, নতুন প্রযুক্তি দিচ্ছে কি না, নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে কি না।

গবেষণার উৎকর্ষের অন্যতম শর্ত সততা। প্ল্যাজারিজম, তথ্য-উপাত্ত জালিয়াতি, একই গবেষণা অনৈতিকভাবে একাধিক জায়গায় প্রকাশ এবং ভুয়া জার্নালে প্রকাশ গবেষণার প্রতি আস্থা নষ্ট করে। এসব রোধে শুধু শাস্তি যথেষ্ট নয়, দরকার সচেতনতা, প্রশিক্ষণ, নৈতিক তত্ত্বাবধান ও নিরপেক্ষ তদন্ত। এ লক্ষ্যে জিইউবিতে একটি যুগোপযোগী প্ল্যাজারিজম পলিসি চালু করা হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিতে সরকার, ইউজিসি ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপনে সহায়তা, জাতীয় পর্যায়ের উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং অবকাঠামোতে প্রবেশাধিকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সহায়তা এবং শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় প্রণোদনা। গবেষণার ফলকে পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক উদ্ভাবনে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও কার্যকর নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং আমাদের সক্ষমতা যাচাই ও উন্নয়নের একটি সুযোগ দিয়েছে। তবে র‌্যাংকিংয়ে এগোনোর টেকসই পথ হলো মানসম্মত শিক্ষা, মৌলিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণার সততা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি। আমাদের স্বপ্ন এমন একটি গ্রিন ইউনিভার্সিটি, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ডিগ্রি নেবে না, জ্ঞান সৃষ্টি, সমস্যা সমাধান, উদ্ভাবন ও মানবকল্যাণে অবদান রাখার সক্ষমতাও অর্জন করবে। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি দরকার পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য মাপা হবে তার শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ হলো, তার গবেষণা কতটা নতুন জ্ঞান দিল এবং সেই জ্ঞান মানুষের জীবন ও দেশের উন্নয়নে কতটা কাজে লাগল, তা দিয়ে। র‌্যাংকিং তখনই অর্থবহ, যখন তা এই বৃহত্তর লক্ষ্যের সহায়ক হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত