জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৯ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংকে আমি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক অবস্থান, গবেষণার সক্ষমতা, একাডেমিক সুনাম এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করি। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ তৈরি করে। তবে র‌্যাংকিংকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মানের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উৎকর্ষ শুধু গবেষণাপত্র, সাইটেশন কিংবা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অবদান, স্থানীয় সমস্যা সমাধানে গবেষণার ভূমিকা এবং জ্ঞান সৃষ্টিতে অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

র‌্যাংকিংয়ের জন্য কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও সূচকে পার্থক্য আছে। এসব সূচকের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সম্পর্ক কেমন?

কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) দুটোই বেশ জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী র‌্যাংকিং। কিন্তু এ দুটি লীগ টেবিলের র‌্যাংকিং পদ্ধতিতে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিউএস র র‌্যাংকিংয়ে একাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, গবেষণায় উদ্ধৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত এবং আন্তর্জাতিকীকরণের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে টিএইচই শিক্ষাদান, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার মান, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের ওপর তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত গুরুত্ব দেয়।

এই সূচকগুলো উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণার উৎকর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সব সূচক সরাসরি শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপ করে না। উদাহরণস্বরূপ, বেশি সাইটেশন পাওয়া একটি গবেষণার আন্তর্জাতিক প্রভাব নির্দেশ করতে পারে; কিন্তু সেটি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান বা স্নাতকদের দক্ষতার সরাসরি প্রতিফলন নয়।

একইভাবে, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা একটি প্রতিষ্ঠানের বৈশি^ক সম্পৃক্ততার পরিচায়ক হলেও তা এককভাবে গবেষণার উৎকর্ষ নিশ্চিত করে না।

সুতরাং, র‌্যাংকিংয়ের সূচকগুলোকে একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের উচিত র‌্যাংকিংয়ের সূচকগুলোর পাশাপাশি শিক্ষার মান, গবেষণার মৌলিকত্ব, গবেষণার সামাজিক প্রভাব এবং স্নাতকদের কর্মদক্ষতার মতো বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা।

বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনে আন্তর্জাতিক গবেষণা-সহযোগিতা, গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি, একাডেমিক সুনাম ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণা একটি আন্তর্জাতিক ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এককভাবে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলে গবেষণার পরিধি, মান ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা-সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণার আধুনিক পদ্ধতি, দক্ষ গবেষক এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়। এর ফলে উচ্চমানের গবেষণাপত্র প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে সাইটেশন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

গবেষণাপত্রের সাইটেশন একটি গবেষণা কতটা অন্য গবেষকদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং জ্ঞানচর্চায় প্রভাব ফেলছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। অন্যদিকে একাডেমিক সুনাম একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের শিক্ষাদান, গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টির স্বীকৃতি বহন করে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুমাত্রিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটে। গবেষণায় নতুন ধারণা, আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, এসব সূচক অর্জনের জন্য শুধু বিদেশি শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। তাদের জন্য মানসম্মত গবেষণা পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।

র‌্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের অগ্রগতি যাচাই করার তথ্য সহজলভ্য নয়। আপনি কি তা মনে করেন?

হ্যাঁ, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে কতটা উন্নতি করেছে, কোন সূচকে ভালো করছে এবং কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে এসব তথ্য নিয়মিত ও সহজে পাওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তার সামগ্রিক অবস্থান বা র‌্যাংকিং প্রকাশ করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূচকভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য, আগের বছরের তুলনায় অগ্রগতি, দুর্বলতার জায়গা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয় না। তবে কিউএস ও টিএইচই এ দুটি প্রতিষ্ঠানই র‌্যাংকিংয়ের বিস্তারিত তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে দেয়। 

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কার্যকর রিসার্চ ও র‌্যাংকিং সেল থাকা প্রয়োজন। এই সেল নিয়মিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ও মান, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, স্নাতকদের কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য সূচকের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে একটি ড্যাশবোর্ড থাকা উচিত, যেখানে বছরভিত্তিক অগ্রগতি এবং বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ের সূচক অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেখা যাবে।

মানসম্পন্ন গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, জার্নাল সাবস্ক্রিপশন, ডেটাবেস এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা কি প্রয়োজন?

আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য দক্ষ গবেষক ও গবেষণার আগ্রহের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিজ্ঞান, ফার্মেসি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগার ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করা কঠিন।

গবেষণার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি, মাননিয়ন্ত্রণ সুবিধা, পর্যাপ্ত গবেষণা উপকরণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট এবং দক্ষ টেকনিক্যাল জনবল প্রয়োজন। পাশাপাশি স্কোপাস, ওয়েব অব সায়েন্স, পাবমেড ও সায়েন্স ডাইরেক্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গবেষণা ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনোমিক্স, বায়োইনফরমেটিক্স, মলিকিউলার মডেলিং এবং বিগ ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো ক্ষেত্রে উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধাও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যমান যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। তাই আঞ্চলিক বা জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নির্ধারিত ফি প্রদানের মাধ্যমে গবেষণার সুযোগ পাবেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গবেষণাপত্র ও ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি, ভুয়া জার্নালে প্রকাশের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন ঝুঁকি মোকাবিলায় আপনারা কী ব্যবস্থা নেন?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ, ভাষাগত সম্পাদনা এবং গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এর অপব্যবহার গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা ও একাডেমিক সততার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি, অস্তিত্বহীন রেফারেন্স সংযোজন, গবেষণার ফলাফল বিকৃত করা, ছবি বা পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন এবং নিম্নমানের বা ভুয়া জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রবণতা উদ্বেগজনক।

এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ, গবেষণার পুনরুৎপাদনযোগ্যতা, যথাযথ রেফারেন্স প্রদান, প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধ এবং লেখকত্বের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। গবেষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। কোনো গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হলে জার্নালের নীতিমালা অনুযায়ী তা প্রকাশ করতে হবে। তবে গবেষণার তথ্যের সত্যতা, বিশ্লেষণের যথার্থতা এবং প্রকাশিত ফলাফলের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে গবেষকদেরই নিতে হবে।

গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার আগে জার্নালের মান, স্বীকৃতি, পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া, সম্পাদকীয় বোর্ড এবং প্রকাশকের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নৈতিকতা কমিটির মাধ্যমে অভিযোগ ও অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গবেষণার প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের প্রযুক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকে দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সততা, মৌলিকত্ব এবং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কখনোই প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত