বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। সাত দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন দিশা এমন দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা। এসব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। একই ঘটনায় গ্রেপ্তার তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গেও দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা।
গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালত দিশাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দুই দফা রিমান্ড শেষে দিশাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম জানান, দিশার পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে দিশাকে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার আগের দিন ২৭ অক্টোবর তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কথা
জানিয়েছেন। এর আগে সন্ধ্যায় তারা একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করেন এবং বিভিন্ন জায়গায় খাবার খান। তাহসিফের মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন দিশা।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দিশা মামলার ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে সেসব গোপন রেখে যাচাই করা হচ্ছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু প্রশ্নে নীরব ছিলেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় আরেক সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য ক্রসচেক করা হয়েছে। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মামলায় দিশার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে দিশাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে।
দুই দফায় ৭ দিনের রিমান্ড : গত ১ নভেম্বর রাজধানীর কাফরুল এলাকার নিজ বাসা থেকে জেরিকা তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। পর দিন তাকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেয় আদালত। চার দিনের রিমান্ড শেষে ৪ নভেম্বর দিশাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দফায় মোট সাত দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
যেভাবে রহস্যের সূত্রপাত : গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাহসিফ বাসা থেকে বের হন। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, বন্ধু দীপের ডাকে তিনি বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন। পর দিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা হত্যা মামলা করেন। মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ঘটনার আগের রাতে উত্তরায় তাহসিফ, দীপ ও দিশা একসঙ্গে ছিলেন। তাদের অবস্থান, চলাফেরা এবং পরে কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল এবং এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। দিশাকে কারাগারে পাঠানোর মধ্য দিয়ে তার রিমান্ডপর্ব শেষ হলেও মামলার তদন্তে নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।