ট্রাম্পের পরাজয়ে স্বস্তি অভিবাসীদের মধ্যে

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১১ এএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর অনেকটা স্বস্তি ফিরে এসেছে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ মার্কিন অভিবাসীদের মধ্যে। কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের বড় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও আগামী ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই আধিপত্য থাকবে। সর্বত্রই তার লোক বসানো। ৩ জানুয়ারির পর নতুন কংগ্রেস কাজ শুরু করবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আধিপত্য থাকবে ডেমোক্র্যাটদের। তখন থেকেই আসলে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোনো কিছু করার আগে তিনবার ভাবতে হবে ট্রাম্প প্রশাসন নিযুক্ত এ সংক্রান্ত অভিবাসন বিচারক ও অ্যাটর্নি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরকে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অ্যাগ্রেসিভ মনোভাবের কারণে অসংখ্য অভিবাসী নানা পর্যায়ে গিয়ে ঝুলে আছে। বার বার যোগাযোগ করার পরও জবাব মিলছে না। গত জুলাই মাসে নাগরিকত্বের পরীক্ষার জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার পর ৬ মাস পার হলেও তারিখ আসছে না আবার কারও স্ত্রী গ্রীন কার্ডধারী, স্পাউস ভিসায় গত বছর জুলাই মাসে আবেদন করা হলেও কোনো জবাব পাচ্ছেন না। এসব নানা সমস্যায় দিন কাটছে অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে। তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর সেখানে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

একটি মার্কিন টিভি চ্যানেলের সঙ্গে কথা হয় যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় নিয়োজিত অ্যাটর্নি মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে আসায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য আগামী ২ বছর বিশেষ করে নীতি নির্ধারণে ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তবে ইমিগ্রেশন আইনে কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। অবশ্যই ইমিগ্রেশন পলিসি এবং নীতি প্রয়োগে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে। সিনেট এবং কংগ্রেসের যে জুডিশিয়াল সাব-কমিটি, ইমিগ্রেশনবিষয়ক কমিটিগুলোর নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাট পার্টির সদস্যদের হাতে চলে যাবে। তারা যেকোনো সময় ট্রাম্প প্রশাসনের এজেন্সিগুলো যেমন আইস (ওঈঊ), ইউএসসিআইএস (টঝঈওঝ) এবং সীমান্ত রক্ষাবিষয়ক যেসব এজেন্সি আছে, তাদের সরাসরি ডেকে পাঠিয়ে কীভাবে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে, অতিরঞ্জন হচ্ছে কি না, আইনের কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে কি না তা ক্ষতিয়ে দেখতে পারবে। অর্থাৎ, গত ২ বছর যেভাবে অভিবাসন আইনের প্রয়োগ হয়েছে, সেগুলো আর চলবে না। সবকিছুই জবাবদিহিতার আওতায় আসবে। বাড়াবাড়ি হলে সমস্ত তথ্য ও তদন্ত রিপোর্ট তলব করলে প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তখন বিপদে পড়ে যাবেন। এ ছাড়া আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বর্তমান সরকারের যে অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটিও বাধাগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া বেশিরভাগ রাজ্যের গভর্নর এখন ডেমোক্র্যাট পার্টির দখলে। সেক্ষেত্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ করতে হবে রাজ্যে রাজ্যে। এখানেও ট্রাম্প প্রশাসনের লোকজন বাধার সম্মুখীন হবেন।

অনেক অভিবাসীর আবেদন বিচারাধীন, মামলা চলছে বা চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত হওয়ার রায়ও হয়ে গেছে বা কেউ কেউ এই মুহূর্তে হয়তো গ্রেপ্তারও হয়ে আছেন; তাদের ব্যাপারে কী হবে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি মাহফুজুর বলেন, বর্তমানে যে অভিবাসন এবং আটক বা গ্রেপ্তারের ঘটনা যে নীতির আলোকে হচ্ছে সেটি যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা দেখা হবে। বলা যায়, বেশ কিছু দিন ধরেই মার্কিন এজেন্সি আইস খুবই অ্যাগ্রেসিভ, যখন-তখন যাকে তাকে ধরছে যারা নন-সিটিজেন, এমনকি যাদের মামলা বিচারাধীন তাদেরকেও আটক করে রাখা হয়েছে। উচ্চ আদালতের আদেশও ঠিকভাবে মানছে না, কেয়ারই করছে না তারা। এগুলো পারছে কারণ এ সংক্রান্ত কমিটিগুলো এখনো রিপাবলিকান দলের লোকদের অধীনে। ৩ জানুয়ারির পর এগুলো ডেমোক্র্যাট দলের অধীনে চলে যাবে, তখন আর আইনে ব্যত্যয় হতে পারবে না। তবে এখন থেকেই এসবের একটা প্রভাব তো পড়ছেই।

কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেয় এমন একটি মানবিক কর্মসূচি হচ্ছে ‘অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা (টিপিএস)’। এই কর্মসূচি বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি মাহফুজুর বলেন, এটি মূলত নির্বাহী আদেশে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে যদি দেখা যায় যে, বর্তমান সরকার বেশিরভাগ টিপিএস মর্যাদা বাতিল বা রদ করে দিয়েছে এবং বাতিল বা রদ করার সিদ্ধান্তটি যথাযথভাবে হলো কি না, তা নিয়ে জবাবদিহি করতে পারবে কংগ্রেস। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জানুয়ারির পর এসব বিষয়ে খুব সতর্ক থাকবে; হয়তোবা আগের মতো অ্যাগ্রেসিভ ওয়েতে টিপিএস বাতিল করে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করার প্রবণতা কমে যাবে।

আমেরিকায় গত ২ বছর ধরে যে বিভাজনের রাজনীতি চলছিল, সেখান থেকে কী যুক্তরাষ্ট্র ফেরত আসবে? কি মনে হয় আপনার জানতে চাইলে মাহফুজুর রহমান বলেন, এটা বলা যায় যে বিভাজনের যে একটা রাজনীতি আমেরিকায় চলছিল এবং সারা বিশ্বে এই বিভাজনের যে একটা থিওরি ছড়িয়ে দিচ্ছিল, সেটার বিরুদ্ধে এই নির্বাচন কিন্তু একটা বড় প্রতিবাদ। তরুণ প্রজন্ম কিন্তু অধিক হারে ভোট দিয়েছে এবং এ বছর অনেক দেশেই তরুণদের জাগরণ ঘটেছে। আমার কাছে যেটা মনে হয়, আমেরিকার তরুণরা তা ভোটের মাধ্যমে দেখিয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর আমাদের আদালত চত্বরে আগত মানুষ থেকে শুরু করে সব অভিবাসন আদালত এবং অন্যত্র যেখানে সাধারণত জনসমাগম ঘটে সর্বত্রই একটা স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। অভিবাসী বিচারকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যবশত ট্রাম্প প্রশাসন ৮০ ভাগের বেশি বিচারককে সরিয়ে সেখানে নতুন বিচারক বসিয়েছে। এর মধ্যে অভিজ্ঞ বিচারকও রয়েছেন। এসব বিচারকের মধ্যে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবাপন্ন বিচারকও রয়েছে। সামরিক বাহিনী থেকে ধরে এনে অনেককে বিচারকের আসনে বসানো হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যতটুকু বুঝতে পারি, এসব বিচারকের মধ্যেও কিছুটা পরিবর্তনের আবহ তৈরি হচ্ছে। তবে বিচারকরা যাদের অধীনে কাজ করছেন, তারা এখনো ট্রাম্প নিয়োজিত। তবে এটা ঠিক আগামী ৩ জানুয়ারির পর রায় যদি যথাযথ না হয়, তাহলে তাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত