সুন্দরবনের গহিনে হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের ইতিহাস

খুলনার সুন্দরবনের শেখেরটেক এলাকায় রয়েছে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বছরের পুরোনো একটি মন্দির। এর আশপাশে পাওয়া গেছে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ইটের স্থাপনা, উঁচু ঢিবি ও পুরোনো বসতভিটার চিহ্ন। এসব নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, একসময় সুন্দরবনের এই অংশে গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ।

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
  •  সুন্দরবনের বুকেই কি ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গ?
  • সুন্দরবনের গহিনে মন্দির-দুর্গ, কোথায় গেল সেই জনপদ
  • ৪০০ বছরের পুরোনো মন্দির, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ও বসতভিটার চিহ্ন বলছে, একসময় বনের ভেতরেও ছিল মানুষের বসতি।

সুন্দরবন বলতে সাধারণত মানুষের চোখে ভেসে ওঠে ম্যানগ্রোভ বন, বাঘ, হরিণ আর নদী-খালের বিস্তৃত জলজগৎ। তবে এই বনের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপনা সামনে আনছে ভিন্ন এক ইতিহাস। খুলনার সুন্দরবনের শেখেরটেক এলাকায় রয়েছে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ বছরের পুরোনো একটি মন্দির। এর আশপাশে পাওয়া গেছে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, ইটের স্থাপনা, উঁচু ঢিবি ও পুরোনো বসতভিটার চিহ্ন। এসব নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, একসময় সুন্দরবনের এই অংশে গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ।

স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের কাছে মন্দিরটি ‘বাঘের বাড়ি’ নামে পরিচিত। সুন্দরবনের গহিনে বাঘের বিচরণক্ষেত্রে অবস্থিত হওয়ায় স্থাপনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা গল্প ও বিশ্বাস। তবে লোককথার বাইরে মন্দিরটির স্থাপত্য এবং আশপাশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মন্দিরটির অবস্থান সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের কালাবগী ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন ১৬ নম্বর কম্পার্টমেন্টের শেখেরটেক এলাকায়। শিবসা নদীর পূর্ব পাশের শেখের খাল ও কালীর খালের মধ্যবর্তী স্থানে এর অবস্থান। খুলনা শহর থেকে নদীপথে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের এই স্থাপনায় পৌঁছাতে হয় নৌপথে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে মন্দিরটি প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর আগে নির্মিত। স্থাপনাটিতে মোগল আমলের নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। হাতে তৈরি পাতলা ইট, শামুকের খোলস থেকে তৈরি চুন এবং নদীর বালু দিয়ে এর নির্মাণকাজ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

এক গম্বুজবিশিষ্ট মন্দিরটির স্থাপত্যে রয়েছে চারচালা রীতির প্রভাব। দেয়ালে জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লতাপাতা ও পোড়ামাটির অলংকরণ দেখা যায়। স্থাপনাটির ভেতরে ছোট একটি কুঠরি রয়েছে। নির্মাণকৌশল ও নকশা বিশ্লেষণ করে এর ঐতিহাসিক সময়কাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে শেখেরটেকের গুরুত্ব শুধু এই মন্দিরে সীমাবদ্ধ নয়। এর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ইটের দেয়াল, মাটির উঁচু ঢিবি ও পুরোনো স্থাপনার চিহ্ন ইঙ্গিত দেয়, এখানে একসময় বড় ধরনের বসতি ছিল।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে শেখেরটেক এলাকার প্রাচীন স্থাপনা ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বর্ণনায়, এলাকাটিতে একসময় প্রাচীরঘেরা দুর্গ, পুকুর, ইটের বাড়ি এবং বসতভিটা ছিল। স্থানীয় বাওয়ালিদের কাছে স্থানটি ‘বড় বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল।

সুন্দরবনের এই জনপদের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের শাসনামলের সম্পর্ক নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, ১৬ শতকের শেষ দিকে রাজা প্রতাপাদিত্য দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বনদস্যু ও জলদস্যুদের মোকাবিলায় শিবসা নদীর তীরে দুর্গ নির্মাণের কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখেরটেক এলাকার ধ্বংসাবশেষ সেই সময়ের কোনো স্থাপনার অংশ কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থেও সুন্দরবনের প্রাচীন স্থাপনা ও প্রতাপাদিত্যের সময়কার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আলোচনা রয়েছে।

শেখেরটেকের পাশাপাশি শিবসা নদীর তীরেও রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। সেখানে ইটের তৈরি স্থাপনার চিহ্ন, উঁচু মাটির ঢিবি এবং ছড়িয়ে থাকা ইটের স্তূপ দেখা যায়। নদীভাঙন ও জোয়ারের পানিতে স্থাপনাটির অবশিষ্টাংশ ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থেও এ এলাকার প্রাচীন স্থাপনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে স্থানটি ‘শেখের বাড়ি’ নামে পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব নিদর্শনের গুরুত্ব কেবল স্থাপত্যের বয়সের কারণে নয়; বরং সুন্দরবনের অতীত জনবসতি, সামাজিক কাঠামো এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করে বলে। বর্তমানে যে এলাকাকে দুর্গম বনাঞ্চল হিসেবে দেখা হয়, সেখানে একসময় কীভাবে মানুষ বসতি গড়েছিল, তাদের জীবিকা কী ছিল এবং কেন সেই জনপদ পরিত্যক্ত হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, জোয়ারের পানির চাপ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় মন্দিরটিরও বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দেয়ালে ফাটল ও ইট খসে পড়ার ঘটনা স্থাপনাটির অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। পরে বন বিভাগের অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তায় মন্দিরটি সংস্কার করা হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়। পুরোনো স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করে এর সংরক্ষণকাজ করা হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সেখানে ফুট ট্রেইল ও ওয়াচ টাওয়ারসহ কিছু অবকাঠামোও তৈরি করা হয়েছে।

সুন্দরবনের এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো নিয়ে নতুন করে গবেষণার সুযোগ থাকলেও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। শেখেরটেকের মন্দির ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে রাজা প্রতাপাদিত্যের সম্পর্ক কতটা গভীর, আশপাশের বসতিগুলো কত বড় ছিল, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ প্রয়োজন।

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষাও জরুরি। কারণ এসব স্থাপনা কেবল পুরোনো ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এগুলো দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস, জনবসতি ও সভ্যতার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ করা গেলে সুন্দরবনের অজানা অতীতের আরও অনেক অধ্যায় উন্মোচিত হতে পারে।

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত