রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ দূর করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, এফআইডি বহাল থাকায় ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ ও পদায়নে অনিশ্চয়তা এবং জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকের আগে জমা দেওয়া এক আলোচনা পত্রে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনা পত্রে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত বছরের অক্টোবরে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ ও মেয়াদসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। আলোচনা পত্রে বলা হয়, গত ১৯ অক্টোবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে। কিন্তু সাত দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক অসংগতি ও নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তার প্রকাশ বলে মনে করেন এই সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি। বিশেষ করে সাউথইস্ট ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জনতা ব্যাংকের এমডি এবং যমুনা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর প্রস্তাব, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভিজ্ঞ সরকারি ব্যাংকারদের মধ্য থেকে করতে হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে আলোচনা পত্রে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য মতে, জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি, ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকে ২৯ হাজার ২৯ কোটি, রূপালী ব্যাংকে ১৯ হাজার ২৮১ কোটি, সোনালী ব্যাংকে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি, বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ১৩১ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (বিডিবিএল) ৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। আলোচনা পত্রে জনতা ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণের পেছনে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ, অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ অনিয়মের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়োগের ফলে এসব অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে পুরো ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। পরবর্তী তিন মাসে এই ঋণ আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংক খাতের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন সংসদ সদস্য।
আলোচনা পত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মেয়াদ ও অপসারণের বিষয়টি আইন দিয়ে সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। যাতে নির্বাহী বিভাগ ইচ্ছামতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ এবং পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম মূল্যায়নে মূল কর্মসম্পাদন সূচক (কেপিআই) চালুর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আলাদা করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নীতিমালার আলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ায় সরকারি ব্যাংকারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে এ অসন্তোষ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে আসছে বিভাগটি।