নেই সুপেয় পানি ও টয়লেট

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ৩০টিতেই নেই সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ন্যূনতম ব্যবস্থা। অন্যদিকে ১২টি ক্লিনিক চলছে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন অবস্থায়। এমন চরম দুর্ভোগ ও অচলাবস্থা মাথায় নিয়েই বছরের পর বছর প্রান্তিক মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা। পানি ও স্যানিটেশনের এই তীব্র সংকটের কারণে ক্লিনিকে আসা সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নিরুপায় হয়ে কোনো কোনো ক্লিনিক পাশের বাড়ি কিংবা মসজিদ থেকে সাময়িকভাবে পানি সংগ্রহ করে কাজ চালাচ্ছে। আবার কোনো কোনোটিতে সেই সুযোগও নেই। এক যুগেরও বেশি সময় এমন পানির কষ্টে ধুঁকছে তালিকায় রয়েছে এমন ক্লিনিকও।

তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এসব কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করলেও, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু বছর ধরে সেগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ভবনগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর ওপর নেই কোনো নৈশপ্রহরী বা নিরাপত্তাব্যবস্থা, যার ফলে প্রায়শই ঘটছে চুরির ঘটনা। চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান ওষুধ ও আসবাবপত্র। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সামগ্রিক চিকিৎসাসেবা, ক্ষুব্ধ হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০১ সালের দিকে উপজেলার একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বিভিন্ন গ্রামের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রতিষ্ঠা করে। সব মিলিয়ে ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয় স্বাস্থ্যসেবা হাতের কাছে পৌঁছে দিতে। সেই থেকে মানুষ সহজেই নিজ গ্রামে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পেতে থাকে। কিন্তু দিন দিন ক্লিনিকগুলো নানাভাবে নষ্ট আর জরাজীর্ণ হতে থাকে। ভাঙতে থাকে বিল্ডিং, নষ্ট হতে থাকে আসবাপত্র। এরমধ্যে বেশ কিছু ক্লিনিক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নেই পানির ব্যবস্থা, নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও। নেই সীমানা প্রাচীর। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। নানা অভাব নিয়েও স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের পাশে থেকে সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসের শেষের দিকে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ উপসচিব বরাবর উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। সেখানে বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকের জরাজীর্ণ অবস্থা আর নানা অবকাঠামোগত অবস্থা জানিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়। সেখানে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জরাজীর্ণ আর পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখনো সে ব্যাপারে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি। 

বরমী ইউনিয়নের বরকুল কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এ ক্লিনিকে অন্তত ১৩ বছর কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। বালতি ভরে ভরে বাথরুমে পানি রাখা হয়। সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা সেই পানি ব্যবহার করেন। আমরা খাবার পানির কষ্ট করি। পাশের বাড়ি থেকে সাধ্যমতো এনে রাখি। তিনি বলেন, এ বিল্ডিং বেশ জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। ছাদে ফাটল ধরে পলেস্তারা খসে পড়ে। ক্লিনিকে আসার রাস্তাটাও কাঁচা। মেঘ-বৃষ্টির দিন রোগীরা আসতে চরম কষ্ট করেন। আমরা বহুবার বলেছি কিন্তু পানির এ সংকটের সমাধান হচ্ছে না।’

নয়াপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের এ ক্লিনিকে গড়ে ৪০-৫০ জন রোগী আসেন সেবা নিতে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করি। কিন্তু সেবা নিতে আসা রোগীরা খাবার পানির কষ্ট করেন। অনেক সময় টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হয় কিন্তু পানির অভাবে তা ব্যবহার করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতি জরুরি দরকারি পানি পাশের মসজিদ থেকে এনে আমরা চলি। এ দুর্ভোগ বছরের পর বছর চলছে। তবে বিদ্যুৎব্যবস্থা আছে।’

সিমলাপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী (সিএইচসিপি) শাহিনুর আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ক্লিনিকে পানির ব্যবস্থা নেই, বিদ্যুতের ব্যবস্থাও নেই। প্রায় তিন বছর থেকে এ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আশপাশে বসতিও নেই। টয়লেটের প্রয়োজন হলে ক্লিনিকে তালা লাগিয়ে একটু দূরের বাড়িতে গিয়ে ওয়াশরুম ব্যবহার করি। পানির অসুবিধার জন্য রোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।’ তিনি বলেন, ‘চলতি মাসেও (অক্টোবার) ৯শ রোগী সেবা নিয়েছেন আমাদের এ ক্লিনিকে। আমরা দ্রুত এ দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চাই।’

শ্রীপুর উপজেলা কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জহিরুল ইসলাম জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকের অন্তত ৬০ শতাংশ ক্লিনিকে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্যকর্মীসহ সেবা নিতে আসা নানা বয়সী রোগীরা পানির কষ্ট করেন। প্রয়োজনে ওয়াশরুম ব্যবহারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন  থেকেই এ প্রয়োজনীয় পানি নিয়ে দুর্ভোগ স্বাস্থ্যকর্মীরা ভোগ করছেন। সেবা নিতে আসা রোগীরাও ভোগ করছেন। নানাভাবে বলেও এ কষ্টের কোনো সুরাহা হয়নি। আমরা এ দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চাই। 

শ্রীপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চিঠি লিখেছি দপ্তরে। আমাদের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে, সে মোতাবেক আমরা সব তথ্য দিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নানা কারণে ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে পড়েছে। আশা করি আসছে বছর সব সমস্যার সমাধান হবে। পানির সংকট কেটে যাবে। মানুষ সেবা নিতে এসে আর কষ্ট করবে না। সরকার চেষ্টা করছে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও আধুনিক ও হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভুঞা বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সমস্যাগুলোর ব্যাপারে অবহিত করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি দুর্ভোগ কমিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত