মৌলভীবাজারে চা বাগানে গোলমিরচ চাষে বিপ্লব

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

ঝাল ও মসলাদার খাবারের অন্যতম উপাদান গোলমরিচ। গরম মসলার অবিচ্ছেদ্য এই উপাদানটির বাণিজ্যিক চাষাবাদ দেশে তেমন বিস্তৃত নয়। তবে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা-বাগানে গোলমরিচ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলার কয়েকটি চা-বাগানে শতাধিক হেক্টর জমিতে সফলভাবে চাষ হচ্ছে মসলাজাতীয় এ ফসল। এ সাফল্যে বাণিজ্যিকভাবে গোলমরিচ উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলার রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা-বাগানে স্বল্প পরিসরে গোলমরিচ চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রাজনগর ও শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পাঞ্চলে চাষের পরিমাণ বেশি। চা-বাগানের ছায়া দেওয়ার জন্য লাগানো গাছকে অবলম্বন করেই লতানো গোলমরিচের চারা বেড়ে উঠছে এবং ফল দিচ্ছে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, গোলমরিচ পিপারাসি পরিবারের উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Piper nigrum এবং ইংরেজি নাম ব্ল্যাক পেপার। দেখতে অনেকটা পানগাছের মতো এই লতানো উদ্ভিদে চারা রোপণের তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ফল আসে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রায় দুই দশক পর্যন্ত ভালো ফলন দিতে পারে।

গোলমরিচ গাছে লম্বা গুচ্ছে ছোট হলুদ ফুল ফোটে। পরে সেগুলো ফলে পরিণত হয়। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকে ফল লাল রং ধারণ করলে তা সংগ্রহ করা হয়। দেশে চাষ করা প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে চার থেকে পাঁচ কেজি কাঁচা গোলমরিচ পাওয়া যায়। ফল সংগ্রহের পর গুচ্ছ থেকে আলাদা করে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করতে হয়। এরপর প্রায় এক সপ্তাহ রোদে শুকিয়ে বাজারজাত ও খাবারের উপযোগী করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় চার থেকে পাঁচ কেজি কাঁচা গোলমরিচ থেকে গড়ে দুই কেজি শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন উপজেলার চা-বাগানে শতাধিক হেক্টর জমিতে গোলমরিচ চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাম ও পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে এ মসলার আবাদ করা হচ্ছে।

রাজনগর চা-বাগান এবং শ্রীমঙ্গলে ফিনলে টি কোম্পানির বর্মাছড়া ও হরিণছড়া চা-বাগানসহ বেশ কয়েকটি বাগানে ছায়াদানকারী গাছকে কেন্দ্র করে গোলমরিচের চাষ হচ্ছে।

রাজনগর চা-বাগান সূত্র জানায়, প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর ধরে বাগানের বাংলো এলাকায় গোলমরিচ চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে সেখান থেকে প্রতিবছর প্রায় দেড় মণ বা ৬০ কেজি গোলমরিচ সংগ্রহ করা হয়। পরে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প পরিসরে চাষ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বেড়েছে। আগামীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গোলমরিচ চাষের পরিকল্পনা করছে বাগান কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফিনলে টি কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের কোম্পানির অনেক চা-বাগানেই গোলমরিচ চাষ হচ্ছে। এ ফসলের জন্য আলাদা যত্ন কিংবা অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হয় না। বাগানের ছায়াদানকারী গাছের নিচে গোলমরিচের চারা রোপণ করলে তা নিজে থেকেই গাছ বেয়ে বেড়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে ফল দেয়। চাষ করা গোলমরিচে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। তার মতে, মৌলভীবাজারে বাণিজ্যিকভাবে এ মসলার চাষ করা হলে সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মৌলভীবাজারের মাটি ও আবহাওয়া মসলাজাতীয় ফসল চাষের জন্য উপযোগী। রাজনগর, শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন উপজেলার চা-বাগান এবং পাহাড়ি এলাকার বাড়িঘরে স্বল্প পরিসরে গোলমরিচ চাষ হচ্ছে। চা-বাগানগুলোতে প্রায় শতাধিক হেক্টর জমিতে এ ফসলের আবাদ হচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে গোলমরিচের চাহিদার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মৌলভীবাজারে বাণিজ্যিকভাবে গোলমরিচ চাষ করা গেলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলার চাহিদারও একটি অংশ মেটানো সম্ভব হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা অনেকটা কমবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত