'বাংলাদেশ-ভারতকে নিয়েই ফাইনাল করুন, বাকিদের বাড়ি পাঠিয়ে দিন’

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ পিএম

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আয়োজক সংস্থা সাফের নীতির পরিবর্তন দাবি করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রধান কোচ আবদুল্লাহ আল মুতাইরি। তাঁর অভিযোগ, স্বাগতিক দল ও ভারতের সুবিধা বিবেচনায় রেখে প্রতিযোগিতা পরিচালিত হচ্ছে। এমন বাণিজ্যিক স্বার্থ থাকলে অন্য দলগুলোকে প্রতিযোগিতায় রাখার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

টেকনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬-এ ভুটানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ২-২ গোলে ড্র করেছে শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের ৯০ মিনিট পর্যন্ত ২-১ গোলে এগিয়ে থেকেও জয় না পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে রেফারির বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কোচ আবদুল্লাহ আল মুতাইরি।

ম্যাচের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মতে, আজ ভুটানই সেরা ছিল। তারা সাতবার বক্সে ঢুকেছে। এ জন্য খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়া যায় না। আমাদের পারফরম্যান্সে আমি খুব গর্বিত। কয়েকজন চোট পাওয়া খেলোয়াড় নিয়েও আমরা ৯০ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেছি। নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি।’

এরপর রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন এই কোচ। তাঁর দাবি, ভুটানের দ্বিতীয় গোলটি অফসাইড ছিল, শ্রীলঙ্কা একটি পেনাল্টি পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে লাল কার্ড না হলেও অন্তত হলুদ কার্ড দেখানো উচিত ছিল।

মুতাইরি বলেন, ‘রেফারির সব ভুল যদি ভুটানের বিপক্ষেই হয়, তাহলে বাংলাদেশের বিপক্ষে আমাদের কী হবে? সাফের জন্য এটাই আমার বার্তা। এখনই ভিএআর চালু করুন, অথবা রেফারিংয়ের মান উন্নত করার সমাধান খুঁজুন। আমাদের ১৭ নম্বর খেলোয়াড়কে ৯৪ মিনিট পর্যন্ত বক্সের সামনে ছয়বার আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু রেফারি কোনো ব্যবস্থা নেননি। অথচ আমরা বল কেড়ে নিয়ে পাল্টা আক্রমণে গেলে ফাউল দেওয়া হয়েছে।’

এরপর আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘বাণিজ্যিক স্বার্থে যদি ভারত-বাংলাদেশকে ফাইনালে দেখতে চান, তাহলে শুধু এই দুই দলকে নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করুন। অন্য দলগুলোকে প্লে-অফ বা অন্য কোনো সময়ে খেলান। একই ভুল ও একই পরিবেশ চলতে থাকলে অন্য দলগুলোকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন। আমাদের সময় নষ্ট করার দরকার নেই।’

বাংলাদেশকে কেন বারবার টেনে আনছেন, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে মুতাইরি বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাগতিক বলেই তাদের কথা বলছি। আমি ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা জানি। ২০২৩, ২০১৯, ২০১৭, ২০১৫ ও ২০১৩ সালের সাফও দেখুন। বিষয়টি বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে নয়, বিষয়টি ন্যায্যতা নিয়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জায়গায় মালদ্বীপ স্বাগতিক হলে আমি ভারত-মালদ্বীপের কথা বলতাম। শ্রীলঙ্কা স্বাগতিক হলে বাংলাদেশের কোচ ভারত-শ্রীলঙ্কার কথা বলতেন। স্বাগতিক দেশ ও ভারতকে ঘিরে বারবার এমন ঘটনা স্বাভাবিক নয়। সাফের নীতিতে পরিবর্তন আনা দরকার। আমি বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত নই।’

রেফারিরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে আসায় তাঁদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক হবে কি না, এমন প্রশ্নে মুতাইরি বলেন, ‘বিষয়টি রেফারির জাতীয়তা নিয়ে নয়, মান নিয়ে। এএফসি বা ফিফার এলিট রেফারি আনা সম্ভব না হলেও অন্তত ভিএআর রাখা উচিত। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ভিএআর থাকবে, অথচ গ্রুপ পর্বে থাকবে না কেন? খরচের কারণে? খরচ বহন করতে না পারলে প্রতিযোগিতা আয়োজনের দরকার কী?’

নিজেদের ফরোয়ার্ডদের গোলের সুযোগ কাজে লাগানো নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। জবাবে রসিকতা করে মুতাইরি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত গোল করার জন্য আমাকেই মাঠে নামতে হতো! কিন্তু আমার তো দুটি এসিএল ইনজুরি আছে। তাই খেলার সুযোগ নেই।’

তবে ভুটানের বিপক্ষে নিজেদের দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ভুটান বা শ্রীলঙ্কার পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশ নই। ভুটান দারুণ খেলেছে। এটি খুব সুন্দর একটি ম্যাচ ছিল। দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া ছিল।’

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন মুতাইরি। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু একজনকেই ভয় পাই, তিনি আমার বাবা। কিন্তু তিনি ৩০ বছর আগেই মারা গেছেন। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন। তাই আমি আর কাউকে ভয় পাই না।’

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা, ‘আমি কথা দিচ্ছি, শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ম্যাচটি সাফ কাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হবে। আমরা নিজেদের সেরাটা দেব, তারাও দেবে।’

শেষে বাংলাদেশের বিপক্ষে ড্র করলেই দুই দলের সেমিফাইনাল নিশ্চিত—এমন প্রসঙ্গ উঠলে মুতাইরি বলেন, ‘ড্র হলে আমরা সেমিফাইনালে যাব। তাহলে কি আমাকে ড্রয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন?’

এরপর ম্যাচটির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি শ্রীলঙ্কার কাছে হারে বা ড্র করে, তাহলে র‍্যাঙ্কিংয়ে আমরা তাদের ছাড়িয়ে যাব। তখন বাছাইপর্বে আমরা পট-১-এ থাকব, বাংলাদেশ থাকবে পট-২-এ। ফলে তাদের হংকং, ইয়েমেন কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দলের বিপক্ষে প্লে-অফ খেলতে হতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জেতা ছাড়া বিকল্প নেই।’

এভাবেই রেফারিং নিয়ে ক্ষোভ, সাফের নীতি নিয়ে প্রশ্ন এবং বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচের গুরুত্ব তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন শ্রীলঙ্কার কোচ আবদুল্লাহ আল মুতাইরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত