গবেষণায় সময় কম শিক্ষকদের

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৬ এএম

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা পাঠদান ও গবেষণা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন নেওয়া, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্র তৈরি, পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন, উত্তরপত্র মূল্যায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক-অ্যাকাডেমিক দায়িত্বও সামলাতে হয়। ফলে গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সময় বের করা অনেক শিক্ষকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের এ চাপ কিছুটা কমাতে পারে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা টিএ ব্যবস্থা। কিন্তু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের টিএ হিসেবে যুক্ত করে শিক্ষককে একাডেমিক সহায়তার কোনো অভিন্ন কাঠামো নেই। ফলে টিএ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় টিএ ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (আরএ) হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময়ও তার সঙ্গে দুজন টিএ কাজ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের টিএ বা আরএ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে তাদের মধ্য থেকে দক্ষ শিক্ষক ও গবেষক তৈরি করা সম্ভব।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএ নিয়োগের বিষয়ে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিএ নিয়োগের কোনো বিধান নেই। ইউজিসি বা সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে বাজেট দেয়, তা নির্দিষ্ট কোড অনুযায়ী ব্যয় করতে হয়। ফলে টিএ নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহ থাকলেও বাজেট কাঠামোর কারণে তা সম্ভব হয় না। আমি টিএ নিয়োগের পক্ষে। টিএ নিয়োগ করা গেলে শিক্ষকদের কাজের প্রেসার কমবে। ফলে তারা গবেষণায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেও ভবিষ্যতের ভালো শিক্ষক ও গবেষক তৈরি করা সম্ভব হবে।’

২০২২ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের টিচিং লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা অনুমোদন করে। নীতিমালায় একজন শিক্ষককে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪০ ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার কাঠামো রাখা হয়। এর মধ্যে গড়ে ১৩ ঘণ্টা সরাসরি পাঠদান, ল্যাব ও থিসিস তত্ত্বাবধান এবং বাকি ২৭ ঘণ্টা প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, গবেষণা, বই বা প্রবন্ধ লেখা এবং প্রশাসনিকসহ অন্যান্য কাজে দেওয়ার কথা বলা হয়। নীতিমালায় পদভেদে সরাসরি পাঠদানের সময়ও আলাদা করা হয়েছে। অধ্যাপকের জন্য গড়ে ১০ ঘণ্টা, সহযোগী অধ্যাপকের ১২ ঘণ্টা, সহকারী অধ্যাপকের ১৪ ঘণ্টা ও প্রভাষকের ১৬ ঘণ্টা সরাসরি পাঠদানের কথা বলা হয়েছে। ফলে গবেষণার জন্য নির্ধারিত সময়ের বড় অংশ চলে যায় পরীক্ষা ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনার কাজে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) লোক প্রশাসন বিভাগে ৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে একজন শিক্ষা ছুটিতে ও একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। এই বিভাগে বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ছয়টি ব্যাচ রয়েছে। প্রতি ব্যাচে গড়ে ৫০ জন করে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০০ জন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ৩৩:১, ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের বাদ দিয়ে হিসাব করলে অনুপাত আরও বাড়বে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অনুপাত আন্তর্জাতিকভাবে ২০:১। তবে এখানেই শেষ নয়, সক্রিয় ৭ শিক্ষকের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন ৫ জন শিক্ষক।

একজন শিক্ষককে ক্লাসের বাইরে আর কোন কোন কাজে সময় ব্যয় করতে হয় এমন প্রশ্নের জবাবে লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাশেম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি কোর্সের প্রশ্ন তৈরি, মডারেশন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র দেখা, নম্বর সংরক্ষণ ও ফলাফল তৈরির কাজ করতে হয়। পাশাপাশি অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাস টেস্ট, প্রেজেন্টেশন, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ এবং বিভাগীয় বিভিন্ন কমিটির দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিক্ষকদের সংখ্যা কম থাকায় মাত্রাতিরিক্ত কোর্স নিতে হয়। ফলে কোর্স সম্পর্কিত অন্য কাজেও সময় ব্যয় করতে হয়।

এটা কেবল গোবিপ্রবি কিংবা লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষকদের চিত্র নয়, দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই কম-বেশি একই চিত্র। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, টিএ ব্যবস্থা চালু থাকলে ক্লাস ও গবেষণায় তারা বেশি সময় দিতে পারতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষকরা এমনিতেই প্রেসারে আছেন। ইউরোপের কোনো দেশে অধ্যাপকদের কখনো, প্রশ্ন তৈরি, মডারেশন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র দেখা, নম্বর সংরক্ষণ ও ফলাফল তৈরির কাজ করতে হয় না। এসব কাজ টিএ করেন। ক্লাস ও গবেষণার বাইরের কাজগুলো টিএ দিয়ে করালে সময় সাশ্রয় হয়, যা গবেষণার কাজে সহায়ক। অন্যদিকে টিএদের ভবিষ্যৎ শিক্ষক হিসেবে প্রস্তুত করা যায়।

একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিএ সুবিধা চালু হলে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভালো হয়। কিন্তু টিএর বেতন-ভাতা কোথায় থেকে দেওয়া হবে. তা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। আমাদের দেশে রিসার্চ ফান্ড সহজলভ্য নয়, আবার একজন অধ্যাপকের সবসময় রিসার্চের ফান্ড নাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউজিসির সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকে এবং বরাদ্দ থাকে তাহলে তা ভালো হয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) একজন শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষকরা পারিতোষিক থেকে যে টাকা পান, এর সাথে ইউজিসি কিছু ফান্ড বরাদ্দ দিলেই কিন্তু টিএ নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো শিক্ষকই পারিতোষিকের টাকার ভাগ ছাড়তে চাইবেন না। বছরে কেবল পারিতোষিকের জন্য বেরোবির ২২টি বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরাদ্দ থাকে দেড় কোটি টাকার বেশি।

তার তথ্য মতে, বেরোবির একজন শিক্ষক ৩ ঘণ্টার ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির জন্য ২ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া ১ ঘণ্টার মিড সেমিস্টারের জন্য ৬০০ টাকা, ফাইনাল পরীক্ষায় হলে ডিউটি দিয়ে ২ হাজার ১০০ টাকা, মিড সেমিস্টারের ডিউটি দিলে ৭০০ টাকা, ফাইনাল পরীক্ষার খাতা কাটলে প্রতিটির জন্য ৯০ টাকা, মিডের খাতা কাটলে ৩৫ টাকা করে পেয়ে থাকেন। এর বাইরে ল্যাব, ব্যাবহারিক, ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য আলাদা আলাদা টাকা পেয়ে থাকেন।

বুয়েট ২০২১ সালে টিএ নীতিমালা চালু করেছে। সেখানে টিএ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন এবং ল্যাব রিপোর্ট দেখা, শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে টিউটোরিয়াল পরিচালনা, অ্যাসাইনমেন্ট ও ক্লাস টেস্ট মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের অফিস আওয়ার দেওয়ার মতো কাজ করতে পারেন। কিন্তু অন্যান্য বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম নিয়ম নেই। এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে, সেখানে টিএর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হবে।

ভালো শিক্ষক তৈরির সুযোগ : দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক ফলাফল, উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণার যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষার্থী যে স্বয়ংক্রিভাবে ভালো শিক্ষক হবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। এ জায়গায় টিএ ব্যবস্থা একটি প্রশিক্ষণভিত্তিক সেতু তৈরি করতে পারে। মেধাবী স্নাতকোত্তর বা গবেষণার শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞ শিক্ষকের অধীনে টিউটোরিয়াল নেওয়া, অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন, অফিস আওয়ার পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ বোঝার সুযোগ পেতে পারেন। এতে ভবিষ্যৎ শিক্ষকরা চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই শিক্ষকতার মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে ভালো শিক্ষক ও গবেষক হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত