সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। গত ৬ বছর ১০ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০ পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে ধারণা করছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
গতকাল রবিবার প্রকাশিত ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের যাত্রী হিসেবে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কখনো স্বামী-স্ত্রী, কখনো মা-বাবা ও সন্তান, আবার কখনো একই পরিবারের তিন থেকে সাতজন কিংবা আরও বেশি সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সময়ের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহী হিসেবে স্বামী-স্ত্রী নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৯৩টি এবং বাবা-সন্তান নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৫৯টি। অর্থাৎ ১৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী নিহত হয়েছেন ৩৮৬ জন এবং ১৫৯টি মোটরসাইকল দুর্ঘটনায় বাবা-সন্তান নিহত হয়েছেন ৩১৮ জন।
এ ছাড়া অটোরিকশার যাত্রী হিসেবে একই পরিবারের দুজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ২১১টি, তিনজন নিহতের ঘটনা ১১৮, চারজনের ক্ষেত্রে ৯২, পাঁচজন ৫৩, ছয়জন ৩৮টি এবং সাতজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৩টি। মোট ৫২৫টি দুর্ঘটনায় সড়কে ঝরেছে এক হাজার ৭২৮ প্রাণ।
মাইক্রোবাসের আরোহী হিসেবে একই পরিবারের দুজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ৪৮টি, তিনজন ৪৬, চারজন ৩৯, পাঁচজন ২৮, ছয়জন ২০টি, ১১ জন নিহতের ঘটনা চারটি ও ১৪ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে একটি। মোট ১৮৬টি দুর্ঘটনায় ৭০৮ জন নিহত হয়েছেন।
প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় আরোহী হিসেবে একই পরিবারের দুজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। তিনজন নিহতের ঘটনা ৩১টি, চারজন ২৪ ও পাঁচজন নিহতের ১৯টি ঘটনা ঘটেছে। মোট ১০৮টি দুর্ঘটনায় ৩৫২ জন নিহত হয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্স আরোহী হিসেবে একই পরিবারের দুজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, তিনজন নিহতের ঘটনা ১৫, চারজন নয়টি, পাঁচজন সাত ও আটজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে তিনটি। মোট ৪৫টি দুর্ঘটনায় ১৬২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বাস যাত্রী হিসেবে একই পরিবারের দুজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি, তিনজন নিহতের ঘটনা নয়টি ও চারজন নিহতের ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। মোট ৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৫ জন। এই সময়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিকআপভ্যান উল্টে একই পরিবারের চারজন নিহতের একটি ঘটনা ঘটেছে।
কেন ঘটছে এমন দুর্ঘটনা : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজে বা বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় একটি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির ঝুঁঁকি তৈরি হচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, তবে শুধু একসঙ্গে যাতায়াতকে দায়ী করার সুযোগ নেই। যানবাহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতাও এ ধরনের প্রাণহানির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল, অনেক মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা, এসব যানবাহনের চালকদের অদক্ষতা ও বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া সংস্থাটি মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সংস্থাটি জানায়, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে। তারা নিজেরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে বা পরিবারগুলোর তথ্য অনুসন্ধান করে এ সংখ্যা যাচাই করেননি। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেই সংস্থাটির ধারণা।
দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটির সুপারিশ : সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ, গ্রামীণ সড়কের সঙ্গে মহাসড়কের নিরাপদ সংযোগ তৈরি এবং যানবাহনের চলাচল নিয়মিত নজরদারির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।