দেশ থেকে যে টাকা পাচার হয়েছে, তা ফেরত আনার উদ্যোগকে ‘দিবাস্বপ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। গতকাল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এবারের বাজেট ব্যবসাবান্ধব ও প্রশাসনবান্ধব হয়েছে, যেখানে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে এবারের বাজেটে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং আমরা একটি জনবান্ধব বাজেট পাব। কিন্তু এই বাজেট হয়েছে দুর্নীতি ও অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় ও বৈধতা দেওয়ার বাজেট, একটি সংবিধানবিরোধী বাজেট। যারা বেআইনি পদ্ধতিতে উপার্জন করছে, তাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা টাকা পাচার করে ফেলেছেন, তারা আবার এই টাকা দেশে আনবেন, এটা দিবাস্বপ্নের মতো। এর আগে সরকার একাধিকবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও তেমন সাড়া মেলেনি।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই বাজেট থেকে গরিব মানুষ কিছু পায়নি, বরং বিদেশে যারা বেনামে সম্পদ করেছেন, তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ অনৈতিক, রাজনৈতিকভাবে হঠকারী ও অর্থনৈতিকভাবে অনুপযোগী। একজন একবার চুরি করল, আবার সেই টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দিল। এই দুবার চুরির অপরাধীকে ৭ শতাংশ কর দিয়ে দেশে টাকা ফেরত আনার সুযোগ দেওয়া হলো। অথচ সৎ করদাতারা বছরের পর বছর ৩০-৩২ শতাংশ কর দিয়েছেন। বিদেশ থেকে টাকা ফেরত আনা অলীক কল্পনা। এটা কার্যকর হবে না।
বাজেটকে পর্যবেক্ষণ করে দেবপ্রিয় বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করার জন্য মূল্যস্ফীতিকে মূল সূচক হিসেবে ধরতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দ্বৈত বিনিময় হার এবং সুদের হারে সমতা আনতে হবে। এর পাশাপাশি বাজেটে কৃষি খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং টিসিবিকে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে। সাধারণত নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক অভিঘাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের আয় দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়ে না। আগামী অর্থবছরে তাদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায় তা বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, মেগা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে ভর্তুকি বাড়ানোর সুযোগ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ বেশি হতে হবে, যেটি এই অর্থবছরে কমে গিয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করা হয়েছে। অতিমারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সামনে রেখে এবারের বাজেটকে অনেকেই বলছেন সম্ভাবনাময় ও চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বব্যাপী খাদ্য, সার ও জ্বালানিÑ এই তিনটি প্রধান পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অতিমারীর পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে পারেনি। প্রান্তিক এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবিকা এবং ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের ওপর এসব অভিঘাত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এই প্রেক্ষাপটে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম গতকাল ব্র্যাক সেন্টার-এ ‘জাতীয় বাজেট ২০২২-২৩ : পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কী আছে’ শীর্ষক একটি মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মূল প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন। তিনটি মূল বিষয়ের প্রতিফলন বাজেটে কতখানি হয়েছে তা তিনি আলোচনা করেন। প্রথমত, অতিমারীর প্রভাব স্বাস্থ্যগতভাবে আমরা পার করে এলেও এর আর্থসামাজিক যে প্রভাব নিম্ন-মধ্যবিত্তদের ওপর পড়েছে, তা আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, গত ১০-১৫ বছরে সামষ্টিক অর্থনীতি এরকম চাপে পড়েনি এবং তৃতীয়ত, বিশ্বে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। এই তিনটি বিষয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব কিছু মোকাবিলা করার জন্য অনেক চিন্তা, দক্ষতা এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে।
